মাতৃত্ব মানে দুটো জীবন—একজন মা এবং একজন শিশু (গর্ভস্থ /নবজাতক)। মাতৃত্বের স্বাদ নেওয়া নারী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর অধিকার। নিরাপদ মাতৃত্ব মানে এই দুজনের জীবনের সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়া।
নিরাপদ মাতৃত্বের চারটি স্তম্ভ আবার তিনটি ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হলো:
১. নারীর অধিকার
২. নারী শিক্ষা
৩. প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা
নারী অধিকার ও শিক্ষা
একজন মেয়ে শিশু মানে ‘ভবিষ্যৎ মা’, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্মদাত্রী। এজন্য জন্মলগ্ন থেকেই মেয়ে শিশুটির ঠিক মতো যত্ন নিতে হবে। তার পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পড়াশোনা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের দিকে নজর দিতে হবে। মোটকথা তাকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। সুতরাং এই মেয়ে শিশুটিই পরিণত বয়সে বিয়ে, সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে প্রসবকালীন বা প্রসব-পরবর্তী সেবার ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে। সে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করবে—‘বাল্যবিবাহ আর নয়’।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা
স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য এবং মৌলিক চিকিৎসা সেবা হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এই সেবায় স্বাস্থ্য বিষয়ে স্বল্প মেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণও যুক্ত হতে পারেন। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর প্রান্তিক জনসাধারণের জন্য ১৩ হাজারেরও অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা করছে। প্রতিটি ক্লিনিকে ছয় হাজার মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। আরো আছে দক্ষ প্রশিক্ষিত মাঠকর্মী, যারা বাড়িতে বাড়িতে প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পারেন।
এই বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী ও তার পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে একটি চমৎকার সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হবে:
১. জন্মনিরোধক পদ্ধতি প্রয়োগ নিশ্চিত করা। জনগণকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত মাঠকর্মীদেরকে প্রতিটি দোরগোড়ায় পৌঁছতে হবে।
২. প্রতি গর্ভবতী মা যেন অন্ততপক্ষে নিয়মিত চারবার গর্ভাবস্থায় চেকআপ করান। এতে করে গর্ভজনিত কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত তার প্রতিরোধ বা প্রতিকার করা সম্ভব হবে।
৩. প্রতিটি মায়ের রক্তের পরিমাণ ও গ্রুপ নির্ণয় করা। যাতে করে জীবনরক্ষার প্রয়োজনে ২ থেকে ৩ জন রক্তদাতা সহজে জোগাড় করা যায়।
এছাড়া গর্ভবতী মা এবং তার পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা দরকার। যেমন: গর্ভবতী মায়ের খাবার বা বিশ্রাম, নবজাতকের যত্ন, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া। এ ছাড়া প্রসবকালীন বা প্রসব পরবর্তী বিপদচিহ্নগুলো সম্পর্কে অবহিত করা, যাতে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন। প্রসব পরিকল্পনা অর্থাৎ প্রসবের জন্য কোথায়, কখন এবং কীভাবে যেতে হবে। যাতে করে শুরু থেকেই টাকা-পয়সা, যানবাহন জোগাড় করে রাখতে পারে।
দেশে এখন ৫০ শতাংশ প্রসব বাড়িতে হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক প্রয়াস চালাতে হবে। তাহলে প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য সেবাও অনেকাংশে নিশ্চিত করা যাবে।
লেখক: অধ্যাপক, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ফিস্টুলা সার্জন, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ
আরও পড়ুন: