নিরাপদ মাতৃত্ব হচ্ছে এমন একটি পরিবেশ বা অবস্থা সৃষ্টি করা, যেখানে একজন নারী তাঁর নিজ সিদ্ধান্তে গর্ভবতী হওয়ার পর গর্ভ ও প্রসব সংক্রান্ত জটিলতা ও মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সেবা নিশ্চিতভাবে পেতে পারেন।
নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর অধিকার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মাতৃস্বাস্থ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সাল থেকে ২৮শে মে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালনের ঘোষণা প্রদান করেন। নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে মাতৃমৃত্যুর হার আগের চেয়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এবারের নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের প্রতিপাদ্য ‘হাসপাতালে সন্তান প্রসব করান, মা ও নবজাতকের জীবন বাঁচান’।
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে যেসব সেবায় প্রয়োজন বিশেষ গুরুত্ব:
১. মানসম্মত গর্ভকালীন সেবা
২. নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা
৩. জরুরি প্রসূতি সেবা
৪. প্রসব পরবর্তী সেবা
৫. প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ও সেবা
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের গুরুত্ব
১. গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার নারীর মৃত্যু হয় এবং ২৬ লাখ মৃতজন্মসহ প্রায় ৩০ লাখ নবজাতক অকাল মৃত্যুবরণ করে।
২. বিশ্বে প্রতিদিন ৮০০ জন মা মৃত্যুবরণ করেন।
৩. বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার ৭২০ জন মা এবং প্রতিদিন প্রায় ১২-১৩ জন মা মৃত্যুবরণ করেন।
৪. কোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন ওই দেশের মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হারের উপর।
৫. জরুরি প্রসূতিসেবা, নিরাপদ প্রসব, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার গুণগতমান বৃদ্ধি ও নীতি নির্ধারকসহ সমাজের সকল স্তরের সচেতনতা, অংশগ্রহণ ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণসমূহ
মাতৃমৃত্যুর প্রধান দুটি কারণ-
১. রক্তক্ষরণ – ৩১ শতাংশ
২. একলাম্পশিয়া বা উচ্চরক্তচাপসহ খিঁচুনি – ২৪ শতাংশ
এছাড়া অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে:
১. উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, নারীর প্রতি সহিংসতা ইত্যাদি পরোক্ষ কারণসমূহ – ২০ শতাংশ
২. গর্ভপাত – ৭ শতাংশ
৩. বাধাগ্রস্ত প্রসব বা বিলম্বিত প্রসব – ৩ শতাংশ
৪. কারণ জানা যায় না – ৪ শতাংশ
বর্তমানে বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্যের পরিস্থিত
১. বর্তমানে প্রতি ১০০,০০০ জীবিত জন্মে ১৭২ জন মৃত্যুবরণ করে (এসভিআরএস ২০১৭)। জাতিসংঘের অনুমান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এমএমআর প্রতি ১০০,০০০ জীবিত জন্মে ১৭৬ জন ছিল। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত নিম্নমুখী প্রজনন সক্ষমতা, উন্নততর যত্ন গ্রহণের চর্চা এবং উচ্চতর সেবা গ্রহণের উন্নত সুবিধার ফলে।
২. ৩৭ শতাংশ মা বর্তমানে কমপক্ষে চারটি প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করে থাকেন।
৩. বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি করানোর হার ৪৭ শতাংশ।
৪. প্রসবের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রসব-পরবর্তী সেবা গ্রহণের হার ৩২ শতাংশ।
৫. প্রসব-পরবর্তী সময়ে ৭৩% ভাগ মাতৃমৃত্যু মৃত্যু ঘটে থাকে, যাদের ৫৬ শতাংশ ভাগই মারা যায় প্রসবের ২৪ ঘন্টার মধ্যে। যা মাতৃমৃত্যু মৃত্যু হ্রাসে তাৎক্ষণিক প্রসব-পরবর্তী যত্নের গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
৬. বর্তমানে প্রতিদিন অধিকাংশ মাতৃমৃত্যু মৃত্যু ঘটে থাকে রক্তক্ষরণ (৩১ শতাংশ), খিঁচুনি (এক্লাম্পসিয়া) (২৪ শতাংশ), বাধাগ্রস্ত বা অবিরাম প্রসব-বেদনার (৩ শতাংশ) কারণে।
৭. এমপিডিএসআর–এর তথ্য অনুযায়ী ৫৩ শতাংশ মায়ের মৃত্যুর বাড়িতে হয়ে থাকে (২০১৮)।
মাতৃমৃত্যু রোধে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ
১. ই-ট্র্যাকিং-এর মাধ্যমে সকল গর্ভবতী মা’কে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা।
২. প্রসব-প্রস্তুতি পরিকল্পনা গর্ভবতী নারী ও তার পরিবারের সাথে আলোচনা করা।
৩. ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে ডেলিভারি অবশ্যই পার্শ্ববর্তী জরুরি সেবাকেন্দ্রে করাতে হবে।
৪. দুর্গম অঞ্চলের প্রসূতির জন্য সিএসবিএ’কে প্রাথমিক বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৫. মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যু পর্যালোচনা করে মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬. মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
৭. মিডওয়াইফ-লেড কেয়ার সার্ভিস দেওয়া।
৮. স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নেওয়া।
৯. শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী রেফারেল পদ্ধতি কার্যকর করা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (গাইনি), চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ


গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, নিজেকে যেভাবে সামলাবেন
প্রসবজনিত ফিস্টুলা: নারীর মর্মন্তুদ রোগ
কেমন হবে গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসের খাবার?
