হঠাৎ কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়লে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়তে হয়। কেউ মাথায় পানি ঢালতে থাকে, কেউ পাখার বাতাস করতে থাকে, কেউ পায়ের তালুতে তেল ঘষে, আবার কেউ মুখের ভেতর কিছু দিয়ে পানি ঢালার চেষ্টা করে। এর কিছু কিছু আসলেই জীবন রক্ষাকারী, আবার কিছু কিছু অবৈজ্ঞানিকও বটে। তাই আসলে জানা উচিত, এই মুহূর্তের দায়িত্বশীল আচরণ কোনগুলো।
১. প্রথম কাজ হবে- Call for Help। আশেপাশের মানুষ ডাকা এবং যেকোনো একজনের মাধ্যমে জরুরি সেবাদানকারীকে ফোন করা। অনেক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস আছে যাদের ফোন করলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। এখন বাংলাদেশে ৯৯৯ নম্বরে হটলাইন চালু হয়েছে। তাই প্রথমেই এই কাজ করে ফেলতে হবে।
২. অজ্ঞান ব্যক্তিকে নিরাপদ জায়গায় শুইয়ে দিতে হবে। ধারালো বস্তু, রান্নাঘর, আগুনের উৎস ইত্যাদি বিপজ্জনক জিনিস থেকে দূরে সরিয়ে আনতে হবে। সম্ভব হলে এক দিকে কাত করে দিতে হবে যাতে মুখে, গলায় যে লালা আছে, তা বেরিয়ে আসতে পারে।
৩. নাকের সামনে আঙুল নিয়ে বা বুকের ওঠানামা দেখে বোঝার চেষ্টা করতে হবে যে রোগী শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে কি না। যদি রোগীর শ্বাস বন্ধ থাকে এবং আশপাশে কারও জানা থাকে কীভাবে মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস চালু করতে হয়, তবে তাঁর সাহায্য নিতে হবে।
৪. হাতের নাড়ি ধরে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, নাড়ির কম্পন বোঝা যায় কী না। আজকাল রক্তচাপ মাপার ডিজিটাল যন্ত্র থাকে। রক্তচাপ খুব কম হলে বা পাওয়া না গেলে পায়ের দিকটা একটু উঁচু করে দিতে হবে। অনেক সময়, হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে প্রেশার কম পাওয়া যেতে পারে।
৫. এ সময় যে পদ্ধতিতে বেসিক লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয় তাকেই বলে সিপিআর বা কার্ডিয়ো পালমোনারি রিসাসিটেশন। এটি হার্ট ম্যাসাজ করার একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। কারো জানা থাকলে, তিনি সাহায্যে আসতে পারেন।
৬. জানা মতে, ডায়াবেটিসের রোগী হলে, মুখের ভেতর একটু চিনি দিয়ে দেওয়া ভালো। গ্লুকোমিটার থাকলে পরীক্ষা করে দেখতে হবে, রক্তে গ্লুকোজ কমে গেছে কি না। কিন্তু অজ্ঞান রোগীকে কোনো শরবত বা খাবার গেলানোর চেষ্টা করানো যাবে না, এতে সেই খাবার পানি ফুসফুসে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৭. রোগীর খিঁচুনি শুরু হলে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু না করা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে খিঁচুনি থামতে দিতে হবে, তারপর এক পাশে কাত করে দিতে হবে। মুখে কোনো চামচ বা এ জাতীয় জিনিস ঢোকানোর চেষ্টা করা যাবে না। জোর করে ধরে খিঁচুনি থামানো বা নাকের কাছে বিভিন্ন জিনিস শোঁকানোর চেষ্টা করেও লাভ নেই। রোগীর মুখে বা গালে- চড় থাপ্পড় মেরে জাগানোর চেষ্টা করাও অনুচিত।
পূর্বলক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়
জ্ঞান হারানোর আগে কিছু পূর্বলক্ষণ দেখা যায়। যা থেকে নিজে কিংবা অন্য কারো মাঝে এমন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে পারেন। যেমন: চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, শরীর হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রচুর ঘামতে থাকা, এর সঙ্গে বমি বমি ভাব ও মাথা ঘোরা, সামনের সব বস্তু ঝাপসা দেখা, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া ইত্যাদি। জ্ঞান হারানোর এক বা একাধিক লক্ষণ নিজের বা অন্য কারো মধ্যে দেখা দিলে যদি মনে হয় যে পড়ে যাবেন, তাহলে সাথে সাথেই সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন। এমনভাবে শোয়ার চেষ্টা করবেন, যেন মাথার চেয়ে পায়ের অবস্থান কিছুটা উঁচুতে হয়। পায়ের নিচে বালিশ বা অন্য কোনো বস্তু রেখে সহজেই এই ব্যবস্থা করতে পারেন। যদি শোয়ার মতো অবস্থায় না থাকেন, তবে হাঁটু ভাঁজ করে, মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে কোনো কিছুর ওপর ভর দিয়ে বসে পড়ুন। ডায়াবেটিস আছে যাদের, তাদের পকেটে সব সময় চকোলেট রাখুন, একটানা অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকবেন না। এক স্থানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন না, সম্ভব হলে পায়চারি করুন। গরমকালে প্রচুর পানি পান করুন।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ
আরও পড়ুন: