নারীর বয়ঃসন্ধিকালে একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে শুরু করে প্রতি মাসে পিরিয়ড বা মাসিক হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। ঠিক তেমনি পিরিয়ডের সময় তলপেটে একটু–আধটু ব্যথা অনুভব হওয়াও অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। কিশোরীদের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমবারের মতো পিরিয়ড শুরু হওয়ার সময়ে প্রায়ই ব্যথা হয়ে থাকে। তলপেটে ব্যথা ছাড়াও পিরিয়ডের সময় খিটখিটে মেজাজ, মাথাব্যথা, কোমড়ব্যথা, হাত-পা জ্বালাপোড়া করা, বমিভাব বা বমিসহ বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে।
পিরিয়ডের ব্যথা কেমন ও কোথায় হয়?
পিরিয়ডের ব্যথা সাধারণত তলপেটে খিঁচ ধরে থাকা ব্যথার মতো অনুভূত হয়। তলপেটের পাশাপাশি এটি ঊরু, পা, পিঠ এবং শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পিরিয়ড শুরু হওয়ার কিছু আগে থেকে শুরু করে পিরিয়ড চলাকালীন প্রায় পুরোটা সময়জুড়ে এই ব্যথা থাকতে পারে। অনেক সময় এই ব্যথার তীব্রতা এতো বেশি বেড়ে যায় যে, এর কারণে খিঁচুনি পর্যন্ত হতে পারে। এই ব্যথা সাধারণত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি সময় ধরেও ব্যথা থাকতে পারে।
পিরিয়ডের ব্যথা কেন হয়?
আমাদের শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন্স নামক এক ধরণের পদার্থ উৎপন্ন হয়ে থাকে। পিরিয়ডের সময় জরায়ুর কলা-কোষে এর উৎপাদন বেড়ে যায়। মাসিকের সময়, জরায়ু তার অভ্যন্তরীণ আস্তরণকে বের করে দিতে সংকুচিত হয়। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন্স জরায়ুর পেশি সংকোচনকে ট্রিগার করে এবং প্রদাহ তৈরি করে। ফলে এ সময় ব্যথা হয়।
পিরিয়ডের ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
পিরিয়ডের ব্যথা কমানোর বেশ কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, যেগুলো আমাদের নানী-দাদী, মায়েরা অনুসরণ করে কিছুটা হলেও উপকৃত হতেন। যেমন-
১. ব্যথার স্থানে গরম পানির ভাপ নেওয়া।
২. হালকা ব্যায়াম করা।
৩. পর্যাপ্ত পানি ও পানীয়জাতীয় খাবার খাওয়া।
৪. ল্যাভেন্ডার অয়েল তলপেটে মালিশ করা।
৫. প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ খাবার রাখা।
৬. আদার রস, পেঁপে ও অ্যালোভেরার রস পানে উপকার পাওয়া যায়।
৭. অধিক তেল-মশলাযুক্ত খাবার, চর্বিযুক্ত খাবার ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা ।
পিরিয়ডের ব্যথায় কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
১. যদি পিরিয়ডের ব্যথা এতোটাই তীব্র, মারাত্মক ও অবিরাম হয়, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন।
২. পিরিয়ডের ব্যথার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত ভারী রক্তপাত হয় বা জমাটবাঁধা রক্তের চাকা যায়।
৩. বেশি মাথা ঘুরালে।
৪. ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে।
৫. অস্বাভাবিক বা দুর্গন্ধযুক্ত যোনী-স্রাবের মতো লক্ষণ থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
পিরিয়ডের পেটব্যাথায় তেমন ক্ষতির কোনো আশঙ্কা থাকে না। পিরিয়ড চলাকালে কিশোরী, তরুণীসহ সব নারী সব ধরনের কাজ করতে পারবেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কর্মবিরতির তেমন প্রয়োজন পড়ে না। সর্বোপরি মানসিকভাবে ইতিবাচক থাকা, মনোবল অক্ষুণ্ন রাখা, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সুষম খাবার গ্রহণ পিরিয়ডের ব্যথার সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্তি দিতে সক্ষম। মনে রাখতে হবে, এ সময় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকা খুব জরুরি।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (গাইনি), চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ