গর্ভাবস্থায় কী কী পরীক্ষা করা জরুরি

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪, ০৯:৩৮ এএম

গর্ভাবস্থা একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হওয়া সত্ত্বেও এর বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি। পুরো গর্ভকালীন সময়জুড়ে একজন গর্ভবতী মায়ের শরীরে চলে হরমোনের পরিবর্তন। হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তন আসে দৈহিক গঠনতন্ত্রসমূহেও। প্রত্যেক হবু মায়েরাই তাদের নয় মাসের এই গর্ভাবস্থা এবং প্রসব স্বাভাবিক ও নিরাপদ থাকার প্রত্যাশা করেন। আর এই প্রত্যাশা পূরণের জন্যই তারা চিকিৎসকের কাছে যান।

নিরাপদ গর্ভাবস্থা হবু মা এবং তার অনাগত সন্তান দুজনের সুরক্ষার জন্যই ভীষণ জরুরি। আর এই গর্ভকালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত চেকআপের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শমতো কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করাও খুব প্রয়োজন। এইসব পরীক্ষার মাধ্যমে মায়ের শারীরিক অবস্থা, শিশুর অবস্থান এবং বেড়ে ওঠা ইত্যাদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়। 

গর্ভকাল নিরাপদ রাখতে পরীক্ষাসমূহ

ইউরিন ফর প্রেগন্যান্সি টেস্ট
গর্ভকালের প্রথম পরীক্ষা শুরু হয় প্রেগন্যান্সি টেস্ট দিয়ে। পিরিয়ড বন্ধের এক সপ্তাহ পরেই প্রস্রাব নিয়ে এই টেস্ট করা হয়। গর্ভধারণ করলে প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে নির্গত হরমোন বিটা HCG-এর উপস্থিতির কারণে এ টেস্ট পজিটিভ হবে। প্রস্রাব ছাড়াও রক্তরস বা সিরাম দিয়ে এই টেস্ট করা যায়। পজিটিভ হলে বুঝতে হবে গর্ভধারণ হয়েছে। আর তখন থেকেই আপনার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সময় শুরু হবে। তবে মনে রাখা জরুরি যে, প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ মানেই কিন্তু সবসময় সুস্থ ও স্বাভাবিক গর্ভ নয়। কিছু সময় প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হলেও তা ব্লাইটেড ওভাম, একটোপিক প্রেগন্যান্সি এবং মোলার প্রেগন্যান্সির জন্যও হতে পারে। কাজেই প্রেগন্যন্সি টেস্ট পজিটিভ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ব্লাড গ্রুপ ও আরএইচ টাইপ জানা
নিরাপদ প্রেগন্যান্সির এই পরীক্ষাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের ব্লাড গ্রুপ পজিটিভ হলে সমস্যা নেই, তবে মায়ের গ্রুপ নেগেটিভ আর বাবার গ্রুপ পজিটিভ হলে জটিলতার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রসবের পর শিশুর নাভি থেকে রক্ত নিয়ে ব্লাড গ্রুপ টেস্ট করা হয়। শিশুর গ্রুপ নেগেটিভ হলে সমস্যা নেই কিন্তু পজিটিভ হলে প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মা-কে একটি ইনজেকশন দিতে হয়। মায়ের গ্রুপ নেগেটিভ হলে জটিলতা এড়াতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা আবশ্যক।

রক্তে সুগারের পরিমাণ টেস্ট বা ডায়াবেটিস টেস্ট
নিরাপদ প্রেগন্যান্সি এর অন্যতম শর্ত হল রক্তে শর্করা বা সুগারের পরিমাণ টেস্ট করা। অর্থাৎ ডায়াবেটিস আছে কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা করা। ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভকালীন এবং প্রসবকালীন অনেক জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন গর্ভস্থ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়া, উচ্চরক্তচাপ দেখা দেওয়া, প্রিম্যাচ্যুরিটি, জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশুর জন্ম এমনকি গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। OGTT টেস্ট খালি পেটে বা গ্লুকোজ খাওয়ার দু’ঘণ্টা পর সুগার টেস্ট করতে হবে। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা করাতে হবে। 

আল্ট্রাসনোগ্রাফি
আল্ট্রাসনোগ্রাফি হলো প্রেগন্যান্সির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় টেস্ট। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো অভিজ্ঞ কোনো সনোলজিস্ট দিয়ে ভালো একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে এ পরীক্ষা করাতে হবে। গর্ভাবস্থায় কমপক্ষে ৩ বার আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে হয়। প্রথমবার গর্ভের ৭- ১২ সপ্তাহের মধ্যে, দ্বিতীয়বার ১৮- ২৬ সপ্তাহের মধ্যে এবং তৃতীয়বার ৩২- ৩৭ সপ্তাহের মধ্যে। গর্ভধারণের ৭-৮ সপ্তাহের মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে বাচ্চার অবস্থান, জীবন ও সঠিক গর্ভকাল নিশ্চিত করা হয়। যদি কারো ডিম্ববাহী নালীতে বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ হয়ে থাকে তাহলে এটি বিপদজনক পরিস্থিতি বলে বিবেচনা করতে হবে এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। ১৮- ২৬ সপ্তাহে অ্যানোমালি স্ক্যান করে দেখা হয় শিশুর কোনো জন্মগত ত্রুটি আছে কিনা। সর্বশেষ ৩৭ সপ্তাহের আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে বাচ্চার পজিশন, ওজন, অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ ও প্লাসেন্টার অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিত করা হয়। 

ইউরিন ফর রুটিন এক্সামিনেশন
গর্ভাবস্থায় ইউরিনের রুটিন মাইক্রোস্কপিক টেস্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনেক। আপনার ইউরিন টেস্টের মাধ্যমে জানা যাবে আপনি হবু মা হিসেবে কতটুকু সুস্থ আছেন। ইউরিনে পাস সেল এর অস্বাভাবিক উপস্থিতি জীবাণু দ্বারা মূত্রসংবহনতন্ত্রের ইনফেকশন নির্দেশ করে। মায়ের উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে ইউরিনে প্রোটিন নিঃসরণ হতে গেলে তা প্রি-একলাম্পশিয়া বলে ডায়াগনোসিস করা হয়।

হেপাটাইটিস-বি পরীক্ষা
এই ভাইরাসটি আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে তখনই লিভারকে আক্রমণ করে, আবার কখনোকখনো লিভারকে আক্রমণ না করে সুপ্ত অবস্থায় শরীরে থেকে যায়, অন্যকে সংক্রমিত করার জন্য বাহক হিসাবে কাজ করে। যদি মা এই ভাইরাসটির বাহক হয়ে থাকেন বা গর্ভাবস্থায় এটি দ্বারা সংক্রমিত হোন, তাহলে আপনার গর্ভস্থ শিশুও এটি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। হেপাটাইটিস – বি প্রতিরোধের জন্য শিশু জন্মের পর টিকার ব্যবস্থা আছে। গর্ভাবস্থায় যদি আপনার রক্তে হেপাটাইটিস – বি এর উপস্থিতি ধরা পরে তবে আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞর কাছে পাঠানো হবে।

থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা
থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের কার্যক্ষমতা চেক করার জন্য রক্তের টিএসএইচ হরমোন পরীক্ষা করা হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম থাকলে হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।  

জেনেটিক ডিজিজ টেস্ট
গর্ভাবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হল ক্রোমোজোমাল স্টাডি বা জেনেটিক টেস্ট। যদিও এটি বেশ ব্যয়বহুল একটা পরীক্ষা। তবে এই পরীক্ষার মাধ্যমে অনাগত সন্তানের মধ্যে বংশগত কোনো রোগ প্রবাহিত হচ্ছে কিনা, সন্তানের শরীরে অনিরাময়যোগ্য কোনো অসুখ অথবা প্রাণঘাতী কোনো রোগ সন্তানকে বয়ে বেড়াতে হবে কিনা এ সম্পর্কে জানা সম্ভব। এ ধরনের জেনেটিক ও ক্রোমোজোমাল টেস্ট বিশেষত যারা বেশি বয়সে মা হচ্ছেন এবং যাদের বংশগত রোগ আছে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এইচআইভি টেস্ট
গর্ভবতী মা যদি এই ভাইরাসটির বাহক হয়ে থাকেন, তবে রক্তের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুও এটি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। প্রসবের সময় এমনকি পরবর্তীতে বুকের দুধ খাওয়ার মাধ্যমেও শিশুর শরীরে এই ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে। গর্ভাবস্থায় রক্তে এইচ আই ভি ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পরলে, শিশুর সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর চিকিৎসা রয়েছে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক (গাইনি), চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ

আরও পড়ুন:

হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় এবার সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম বা ‘পাগলা ঘণ্টা’ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে...
বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা
দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ খান, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত এই লবণ খাওয়ার কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের স্পাইন সার্জারি জগতে ইতিহাস গড়লেন ডা. শরীফ আহমেদ জুনায়েদ। তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন (নিটোর)-এর স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। শরীফ...
একসময় যে সাইকেডেলিক বা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলা ওষুধগুলোকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে রাখা হয়েছিল, সেগুলোই এখন আবার আলোচনায়। নতুন করে সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ‘ইবোগেইন’। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড...
এক মাস পর পণ্য রপ্তানি আবার কমল। গেল মে মাসে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৭ শতাংশ। বুধবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
এডিসের মারাত্মক ঝুঁকিতে দেশের চার জেলা- ঢাকা, বরিশাল, নরসিংদী ও কক্সবাজার। এখানে ব্রুটো ইনডেক্সে এডিসের লার্ভার ঘনত্ব ৭৬ থেকে ৯৩ পর্যন্ত মিলেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে গবেষণায় মিলেছে...
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী কারামুক্ত হয়েছেন। বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের চলচ্চিত্র ‘রইদ’ এবার মুক্তি পাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ৬টি শহরে। আগামী ৫ জুন থেকে দেশটির বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে এ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী শুরু...
লোডিং...

এলাকার খবর