বাংলাদেশে সর্পদংশন প্রতিরোধে করণীয় ও বর্জনীয়

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং এর বেশির ভাগ এলাকা নিচু হওয়ায় বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষা ও বন্যার সময় সর্পদংশনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এর প্রধান কারণ হলো, বন্যার সময় সাপের প্রাকৃতিক আবাসস্থল যেমন গর্ত, ঝোপঝাড় ও নিচু ভূমি প্লাবিত হয়ে যায়। ফলে সাপেরা নিরাপদ ও শুষ্ক আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি চলে আসে। একইসঙ্গে ইঁদুরসহ সাপের অন্যান্য শিকারও তাদের গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসে, যা সাপকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং সর্পদংশনের ঝুঁকি বাড়ায়। সাধারণত, সাপ আতঙ্কিত বা আতঙ্কগ্রস্ত হলে আত্মরক্ষার্থে দংশন করে। তাই সর্পদংশন থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আসুন জেনে নিই, সর্পদংশন থেকে বাঁচতে কী কী করা উচিত এবং কী কী এড়িয়ে চলা উচিত।

করণীয়:

. আলো ব্যবহার করুন: সন্ধ্যার পর বা রাতে বাড়ির আশপাশে হাঁটার সময় টর্চ বা লণ্ঠনের মতো ভালো আলোর ব্যবস্থা রাখুন। আলো সাপ দেখতে সাহায্য করে এবং সর্পদংশনের ঝুঁকি কমায়।

. পায়ে ঢাকার উপযোগী জুতো পরুন: গ্রামাঞ্চলে বা যেখানে ঝোপঝাড় বেশি, সেখানে চলাচলের সময় পায়ে খোলা স্যান্ডেল বা চপ্পল পরা এড়িয়ে চলুন। পা সম্পূর্ণ ঢাকার উপযোগী জুতো ব্যবহার করুন, যাতে দংশনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

. আশ্রয়স্থল পরিষ্কার রাখুন: বাড়ির আশপাশে, বিশেষ করে আঙিনা পরিষ্কার রাখুন। ঝোপঝাড়, শুকনো পাতা বা আবর্জনা যেন জমে না থাকে। কারণ, এগুলো সাপের লুকানোর আদর্শ জায়গা।

. দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করুন: সর্পদংশন হলে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিন। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

. প্রাথমিক চিকিৎসার কৌশল শিখুন: সর্পদংশনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানুন এবং অন্যদেরও তা শেখান। দংশনের স্থানে কাপড় দিয়ে হালকা করে বেঁধে দিন এবং আক্রান্ত অঙ্গ নড়াচড়া করবেন না।

কী করবেন না:

. খালি পায়ে চলাচল করবেন না: বিশেষ করে রাতে বা ভেজা জায়গায় খালি পায়ে হাঁটা বিপজ্জনক। সাপ সাধারণত ঘাসের মাঝে লুকিয়ে থাকে, এবং খালি পায়ে হাঁটার ফলে সর্পদংশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

. সাপকে আক্রমণ করবেন না: সাপ দেখলে আক্রমণ করার চেষ্টা করবেন না। বেশির ভাগ সাপ আতঙ্কগ্রস্ত হলে বা আত্মরক্ষার জন্য দংশন করে। সাপকে শান্তিপূর্ণভাবে চলে যেতে দিন।

. ঝোপঝাড় হাত দেবেন না: ঘাস বা ঝোপঝাড়ে হাত দেওয়ার আগে নিশ্চিত হোন যে, সেখানে কোনো সাপ নেই। কারণ, সর্পদংশন সাধারণত অপ্রত্যাশিত স্পর্শের সময় ঘটে।

. লোকজ চিকিৎসায় নির্ভর করবেন না: সর্পদংশনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের লোকজ চিকিৎসা বা প্রচলিত ওষুধে নির্ভর না করে দ্রুত হাসপাতালে যান। সঠিক চিকিৎসা না নিলে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে।

. দংশনের জায়গায় কাটা বা না চোষা: প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, দংশনের জায়গায় কেটে বিষ বের করার চেষ্টা করা হয়, যা সম্পূর্ণ ভুল। এটি রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং বিষ দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

‘RIGHT’ ফর্মুলা: সর্পদংশনের পর প্রাথমিক চিকিৎসার কৌশল

. R- আশ্বাস দিন (Reassurance): সর্পদংশিত ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করুন যে, প্রতিটি দংশনই বিষাক্ত নয়। ৭০ শতাংশের বেশি সর্পদংশন ‘ড্রাই বাইট’; অর্থাৎ, বিষ ছাড়াই ঘটে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে আক্রান্তকে শান্ত থাকতে বলুন।

. I- স্থির রাখুন (Immobilize): দংশিত অঙ্গের ওপর টর্নিকেট লাগাবেন না। বরং একটি মোটা কাপড় (যেমন‑গামছা) ব্যবহার করে হালকা গিঁট দিন। দংশন হাতের আঙুলে হলে বাহুতে এবং পায়ের আঙুলে হলে উরুতে গামছা বাঁধুন এবং অঙ্গ স্থির রাখুন।

. GH- হাসপাতালে যান (Go to Hospital): অঙ্গ স্থির করার পরপরই নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতাল যেতে হবে।

. T- চিকিৎসা নিন (Treatment): দ্রুত সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন। সময়মতো চিকিৎসা নিলে সর্পদংশনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

এই ‘RIGHT’ ফর্মুলা মেনে চললে সর্পদংশনের পরবর্তী বিপদ এড়ানো যাবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়