খাবারের স্বাদবর্ধক হিসেবেই মূলত লবণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে লবণ ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী হওয়ায় খাবার সংরক্ষণেও এটি ব্যবহার হয়। খাবার লবণ হিসেবে আমরা যে লবণ খাই সেটি মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ সোডিয়াম থাকে। আমরা যে পরিমাণ সোডিয়াম গ্রহণ করি, তার বেশির ভাগই আসে খাবার লবণ থেকে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এনএইচএস–এর তথ্য অনুযায়ী, বয়স্কদের প্রতিদিন ৬ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া ঠিক নয়। আবার বয়সভেদে লবণ খাওয়ার পরিমাণ ভিন্ন। ১১ বছর বা এর চেয়ে বেশি বয়স্করা দিনে সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম, ৭-১০ বছর বয়সীরা ৫ গ্রাম, ৪-৬ বছর বয়সীরা ৩ গ্রাম, ১-৩ বছর বয়সীরা ২ গ্রাম এবং এক বছরের কম বয়সীরা দিনে ১ গ্রামের কম লবণ খেতে পারবেন। তবে শিশুদের লবণ খাওয়া ঠিক নয়, কারণ শিশুদের কিডনি পুনর্গঠিত থাকে না বিধায় তারা লবণ হজম ও শোষণ করতে পারে না।
মানবদেহে কোষের প্লাজমা ঠিক রাখতে, কোষের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য, দেহের ক্ষারের মাত্রার ভারসাম্য রক্ষায়, স্নায়ুর সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখা, মাংসপেশি সংকোচন ও শিথিল করতে এবং দেহে পানি ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সোডিয়াম প্রয়োজন তবে তা অল্প পরিমাণে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পূর্ণ বয়স্ক একজন মানুষ দিনে সোডিয়াম গ্রহণের নির্ধারিত মাত্রা হচ্ছে ২০০০ মিলিগ্রামের কম, যা প্রায় ৫ গ্রাম লবণের সমান। কিন্তু বিশ্বের প্রায় সব মানুষ প্রায় ৪৩১০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম গ্রহণ করে যা, ডব্লিউএইচও নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে ১৮ লাখ ৯০ হাজার মৃত্যুর জন্য অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ দায়ী। কেননা অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার, স্থূলতা, মেনিয়ার ডিজিজ নামে এক ধরনের কানের রোগ, কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কিডনি রোগী যাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে তাদের জন্য সোডিয়াম, পটাসিয়াম ও ফসফেট রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এমনকি হাড় থেকেও ক্যালসিয়াম শুষে নিতে পারে বাড়তি সোডিয়াম, ফলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি থেকে অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয়ও হতে পারে।
একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের জন্য খাবার লবণ দরকারি তবে অবশ্যই লবণ আয়োডিন যুক্ত হতে হবে। প্রতিদিনের খাবার থেকেই মানুষ খুব স্বাভাবিক ভাবেই লবণ পেয়ে থাকে। তবে মানুষের জীবনে ব্যস্ততা বাড়ার কারণে এখন অনেকেই প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়ে থাকেন, যেগুলোতে অতিরিক্ত পরিমাণ লবণ থাকে। এছাড়া রেস্তোরাঁ বা ক্যাফের খাবার এবং বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুডেও প্রচুর পরিমাণ লবণ থাকে। যেসব খাবার সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার তার মধ্যে রয়েছে, পাউরুটি, সসেজ, প্রক্রিয়াজাত মাংস, পেস্ট্রি, পিজ্জা, পনির, চিপস ও লবণ বা মশলা দেয়া বাদাম, বিভিন্ন ধরনের সস, কেচাপ ও সয়াসস।
লবণ খাওয়া কমাতে চাইলে প্রথমে খাবার টেবিল থেকে লবণ সরিয়ে ফেলতে হবে এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে সতেজ খাবার খেতে হবে। লবণের পরিবর্তে খাবারে স্বাদ বাড়াতে বিভিন্ন মশলা ব্যবহার করা যায়। যেমন– কালো গোলমরিচ, রসুন, মরিচ বা লেবুর রস। রান্না ও খাওয়ার সময় কতটুকু লবণ ব্যবহার করবেন তার পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী লবণ ব্যবহার করুন। প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার সময় প্যাকেটের গায়ে পুষ্টি মাত্রা চেক করে কম লবণ সমৃদ্ধ খাবার কেনার চেষ্টা করুন। বেশি লবণ দেওয়া খাবার যেমন নোনা মাংস বা নোনা মাছ, পনির, অলিভ এবং আচার কম পরিমাণে খেতে হবে।
সর্বোপরি মানুষ চাইলেই তার স্বাদ পরিবর্তন করতে পারে, সে ক্ষেত্রে কম লবণ খাওয়া অভ্যাস করাটাই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি