হৃদরোগের চিকিৎসায় বাইপাস সার্জারি: কী এবং কেন?

বাইপাস সার্জারি (Coronary Artery Bypass Surgery) হৃদরোগের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হৃৎপিণ্ডের ধমনীগুলোর রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এই সার্জারি করা হয়। এর মাধ্যমে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচলের জন্য নতুন পথ তৈরি করা হয়, যা রোগীর জীবনকে ঝুঁকিমুক্ত করে।

বাইপাস সার্জারি কী?

বাইপাস সার্জারি হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শরীরের অন্য জায়গা থেকে একটি সুস্থ রক্তনালী এনে হৃৎপিণ্ডের বন্ধ বা আংশিক বন্ধ ধমনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে রক্ত নতুন পথ দিয়ে হৃদপিণ্ডে পৌঁছায়, যা রক্ত চলাচল উন্নত করে এবং বুকের ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দূর করে। এই সার্জারির কিছু বিকল্প নামও প্রচলিত আছে। যেমন–

১. করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং (CABG)

২. হার্ট বাইপাস সার্জারি

৩. করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি

কেন বাইপাস সার্জারি প্রয়োজন হয়?

বাইপাস সার্জারি করা হয় হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচলের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার জন্য। বিশেষ করে, যেসব অবস্থায় এ সার্জারি প্রয়োজন হয়। যেমন–

প্রধান ধমনীতে বাধা – হৃৎপিণ্ডের বামপ্রান্তিক প্রধান ধমনীতে রক্ত চলাচল বন্ধ বা সংকুচিত হলে।

বহু ধমনীতে সমস্যা – যখন একাধিক ধমনীর মধ্যে রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয়।

স্টেন্ট ব্যর্থ হলে – যদি আগের স্টেন্ট লাগানোর পদ্ধতি কাজ না করে।

জরুরি অবস্থায় – হার্ট অ্যাটাক হলে এবং তাৎক্ষণিক অন্য কোনো চিকিৎসা কার্যকর না হলে।

বাইপাস সার্জারি হৃদরোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। ছবি: ফ্রিপিকসার্জারির ধরণ

বাইপাস সার্জারির বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। যেমন–

১. অন-পাম্প সার্জারি।

এই পদ্ধতিতে একটি হার্ট-লাং মেশিন ব্যবহার করে হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুসের কাজ চালানো হয়।

২. অফ-পাম্প সার্জারি।

এতে হৃৎপিণ্ড চালু অবস্থায় সার্জারি করা হয়। এটি তুলনামূলক জটিল এবং সব রোগীর জন্য প্রযোজ্য নয়।

৩. মিনিম্যালি ইনভেসিভ সার্জারি।

এতে ছোট কাটের মাধ্যমে সার্জারি করা হয়। এটি সাধারণত কম জটিলতার ক্ষেত্রে করা হয়।

সার্জারির ঝুঁকি

যেকোনো বড় সার্জারির মতো বাইপাস সার্জারিরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। যেমন:

১. রক্তক্ষরণ

২. হার্ট অ্যাটাক

৩. সংক্রমণ

৪. স্ট্রোক

৫. নিউমোনিয়া বা ফুসফুসে জটিলতা

৬. কিডনির সমস্যা

৭. স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা চিন্তায় সমস্যা (সাধারণত অস্থায়ী)

তবে রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে। ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা, বা মহাধমনীতে প্ল্যাক থাকলে ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়?

সার্জারির আগে কিছু প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়:

১. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে।

২. ওষুধ বা ইনসুলিন নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে।

৩. বাড়িতে কেউ সহায়তার জন্য প্রস্তুত আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।

সার্জারির পর জীবনযাপন

সার্জারির পরপরই রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ধাপে ধাপে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। যেমন–

১. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

২. ধূমপান বন্ধ করা

৩. সুষম খাদ্য গ্রহণ

৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

৫. মানসিক চাপ কমান

সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা

কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যেমন–

১. বুকের ক্ষতস্থানে ব্যথা বা লালচে হওয়া, পানি বা পুঁজ বের হওয়া।

২. জ্বর।

৩. দ্রুত হৃৎস্পন্দন।

৪. বুকে ব্যথা বা চাপ, শ্বাসকষ্ট।

সার্জারির ফলাফল

সার্জারির পর বেশিরভাগ রোগী দীর্ঘ সময় ধরে ভালো থাকেন। তবে ধমনীগুলো পুনরায় ব্লক হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক ওষুধ এবং জীবনধারার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। সার্জারির পরও হৃদ্‌রোগ এড়াতে সচেতন থাকা এবং চিকিৎসকের দেওয়া নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এটি মূলত রক্ত চলাচলের সমস্যা দূর করে জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: মিনিম্যালী ইনভেসিভ কার্ডিয়াক এন্ড এওর্টিক সার্জন, জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল