ব্যাট রিও ভাইরাস কতটা ভয়ংকর?

ব্যাট রিও ভাইরাস খুব বেশি ভয়াবহ নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। বিশ্বে ১৯৫৪ সালে প্রথম এ ভাইরাসে আক্রান্তের পর থেকে এতদিন পর্যন্ত যত ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে খুব কম জনেরই মারাত্মক নিউমোনিয়া হয়েছে।

রিও ভাইরাস সংক্রমণের কারণে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তির মস্তিষ্কের প্রদাহ হয়। এটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এনসেফেলাইটিস বলা হয়। মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ যাকে মেনিনজাইটিস বলা হয়। ব্যাট রিও ভাইরাস সংক্রমণের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। সাধারণত ভাইরাস জ্বরের মতই ৫-৭ দিন পর আক্রান্ত ব্যক্তি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যান।

রিও ভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস। রিও ভাইরাস রিও-ভাইরিডি গ্রুপের ভাইরাস। এই ভাইরাস গোত্রের মধ্যে পরিচিত একটি ভাইরাস হলো রোটা ভাইরাস। একে আমরা সবাই চিনি। রোটা ভাইরাস শিশুদের ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ। রোটা ভাইরাসের মতোই একটি ভাইরাস হলো রিও ভাইরাস।

 ব্যাট-রিও ভাইরাস, রিও ভাইরাস পরিবারের একটি সদস্য, যা মূলত বাদুড় (ব্যাট) প্রজাতির মধ্যে বিদ্যমান থাকে। ফাইল ছবিব্যাট-রিও ভাইরাস, রিও ভাইরাস পরিবারের একটি সদস্য, যা মূলত বাদুড় (ব্যাট) প্রজাতির মধ্যে বিদ্যমান থাকে। রিও ভাইরাস পরিবারের সদস্যরা সাধারণত জীবাণু হিসেবে মানুষের মধ্যে ছড়াতে সক্ষম হয়। এই ভাইরাসের নাম ‘ব্যাট-রিও ভাইরাস’। কারণ এটি মূলত বাদুড়ের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে মানুষের মধ্যে ছড়ায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যাট রিও ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা আইইডিসিআর এর পরীক্ষায় দেশের পাঁচজন ব্যক্তির শরীরের এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আক্রান্ত পাঁচজনের কারও ক্ষেত্রে তেমন কোনো জটিলতা দেখা যায়নি। চিকিৎসা শেষে তারা সবাই বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেছেন, ‘খেজুরের কাঁচা রস খেয়ে প্রতি বছর অনেকে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সে রকম লক্ষণ দেখে কয়েকজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাদের নমুনায় রিও ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে’। নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে আসা ৪৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পাঁচজনের শরীরে ব্যাট রিও ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।

ব্যাট-রিও ভাইরাস নিপাহ ভাইরাসের মতোই আরেকটি ভাইরাস। এটি বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ, যেখানে বাদুড়ের সংখ্যাধিক্য রয়েছে সেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাদুড় এ ভাইরাসের প্রাথমিক বাহক। এটি বাদুড়ের রক্ত, শরীরের তরল অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

বাদুড়ের মধ্যে এই ভাইরাস জীবিত থাকে, তাদের মাধ্যমে এটি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ যখন এসব বাদুড়ের সংস্পর্শে আসে বা তাদের দ্বারা সংক্রমিত কোনো প্রাণী বা বস্তু স্পর্শ করে, তখন এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।

বাদুড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস গাছের ফল, যেমন পাকা তেঁতুল, পেঁপে, খেজুরের রস ইত্যাদির ওপর ছড়িয়ে যায়। এসব ফল বা রস খাওয়ার মাধ্যমে মানুষ ভাইরাসের সংক্রমণ লাভ করে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি সরাসরি মানুষের হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াতে পারে।আর এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হয় শিশু ও বয়স্করা।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তা অন্যান্য ভাইরাসের মতোই। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জ্বর, সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, অবসাদগ্রস্থতা হতে পারে। একই সঙ্গে দেখা দিতে পারে ডায়রিয়া। শিশুদের জ্বরের সঙ্গে পুরো শরীরে দেখা দিতে পারে ফুঁসকুড়ি।

ব্যাট রিও ভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য শীত মৌসুমে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, খেজুরের কাঁচা রস পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পেঁপে, তেঁতুল না ধুয়ে খাওয়া খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের যত্ন নেওয়া জরুরি।

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম