এইচএমপিভি ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বিগত ৬০ বছর যাবত এটি মানুষের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ করে আসছে। কিন্তু বিগত কিছুদিন ধরে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যমে আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে নামটি।
আলোচনায় আসার কারণ কী?
বিগত কয়েক সপ্তাহে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু ছবি দেখা যাচ্ছে যে- চীনের হাসপাতালগুলোতে মাস্ক পরা মানুষের ভিড়। কোভিড মহামারির পর থেকে- এমন চিত্র দেখলে, আঁতকে ওঠে প্রাণ। এমন কী, চীনে যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো একটি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা মৌসুমী প্রাদুর্ভাবের মত বাড়ছে, সেটা স্বীকার করেছে বেইজিংও। তাতে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
চীনে ব্যাপকহারে এই ভাইরাসের যে সংক্রমণ, এটাকে বলা হচ্ছে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস বা এইচএমপিভি। এই ভাইরাসে শিশুরাই বিশেষ করে আক্রান্ত হচ্ছে। ভাইরাসটি দশকের পর দশক ধরে আমাদের মধ্যে রয়েছে আর বয়স পাঁচ বছর হওয়ার আগেই প্রায় সব শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে খুব অল্পবয়সী শিশু এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন বৃদ্ধ ব্যক্তির জন্য এই ভাইরাস গুরুতর হতে পারে।
কীভাবে ছড়ায়?
ভাইরাসটি একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য একজন ব্যক্তিতে- হাঁচি-কাশির সময়ে উৎপন্ন ড্রপলেট বা কণার মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত স্থানের স্পর্শ থেকেও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ৬ ফুট বা তার বেশি শারীরিক দূরত্ব- এই সংক্রমণ রোধ করে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে নোসোকোমিয়াল সংক্রমণের ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে।
রোগলক্ষণ কী কী?
এই ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের ৬ থেকে ৯ দিনের মধ্যে রোগলক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সংক্রমণকে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ থেকে আলাদা করা যায় না। প্রধানত ভাইরাসটি শ্বাসনালীর উপরের অংশে মাঝারিমাত্রার সংক্রমণ ঘটায়, তবে কিছুক্ষেত্রে তা তীব্র হয়ে নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে। জ্বর, কাশি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাসকষ্ট নিয়ে- রোগটি প্রকাশ পায়, যেটি সপ্তাহখানেকের মধ্যে সামান্য চিকিৎসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেরে ওঠে। তবে, যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম বা এমন ওষুধ নিচ্ছেন-যেটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, অল্পবয়সী শিশু বা বৃদ্ধ কিংবা যারা অ্যাজমা বা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালীর রোগে আক্রান্ত- তাদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হতে পারে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ
এখনও পর্যন্ত এইচএমপিভি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন নেই। তবে, শ্বাসতন্ত্রের বড় কোনো জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলে, ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিতে হবে। তাই প্রয়োজনে বাইরে বের হলে- মাস্ক পরে বের হওয়া এবং বাসায় ফিরে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা- এই সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চলাই এই ভাইরাসজনিত অসুখকে প্রতিরোধ করতে পারে। আর, যদি জ্বর বা কাশি দেখা যায়, তবে সেক্ষেত্রে- বেশি পরিমাণে তরল খাবার, নাকের ড্রপ- সাধারণ কিছু চিকিৎসায় বাসায় এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব। তবে, তীব্র কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে- দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বৈশ্বিক অবস্থা কতটা শঙ্কার?
এইচএমপিভি কোভিড ১৯-এর মতো কোনো ভাইরাস নয়। আপাতদৃষ্টিতে এই ভাইরাস দিয়ে মারাত্মক কোনো বৈশ্বিক ইস্যু সৃষ্টির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, চীনে এইচএমপিভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে ঠান্ডা আবহাওয়া। এইচএমপিভি সবচেয়ে সক্রিয় থাকে শীত ও বসন্তকালে। শীত মৌসুমে আক্রান্ত বেশি হওয়ার কারণ, সম্ভবত ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভাইরাসটি ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। আর, শীতের সময় মানুষ ঘরের মধ্যেই বেশি সময় থাকে এবং এই বদ্ধ পরিবেশে- ভাইরাস বেশি ছড়ায়।
প্রায় প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ঠান্ডা-কাশি-জ্বরের একটা যে প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে দেখা যায়, আপাতদৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসটিকে এর থেকে আলাদা কিছু বলে মনে হচ্ছে না। তবে যেকোনো ফ্লু-এর মতো মাস্কপরা, হাত ধোঁয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করে আমরা এই রোগ প্রতিরোধ করে- যারা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে আছেন, তাদের নিরাপদ রাখতে পারি।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ


নতুন ভাইরাস নয়, এইচএমপিভি অনেকটা সাধারণ ফ্লু’র মতোই
চীনে ছড়িয়ে পড়েছে আরেক ভাইরাস, লক্ষণ করোনার মতোই 
