১৯৩০ সালে জার্মান বিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে দেখান যে, ধূমপানে ফুসফুসে ক্যানসার হতে পারে। ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীগণ মানুষের জীবনকাল ও ধূমপানের মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক খুঁজে পান। ১৯৫০ সালে বিজ্ঞানী রিচার্ড ডল ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ধূমপান ও ফুসফুস ক্যানসারের একটি সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন।
১৯৫০ সালেই এ সম্পর্কিত পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়, যার প্রত্যেকটিতে ফুসফুস ক্যানসারের সাথে ধূমপানের শক্তিশালী সম্পর্ক দেখানো হয়। এই গবেষণার ফলগুলো ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে ‘স্মোকিং অ্যান্ড কার্সিনোমা অব লাং’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। উক্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, যারা অত্যধিক পরিমাণে ধূমপান করে তাদের ফুসফুস ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা অধূমপায়ীদের তুলনায় পঞ্চাশ গুণ বেশি।
ধূমপায়ী বলতে যারা প্রতিদিন ধূমপান করে তাদের বোঝানো হয়েছে এবং ধূমপান সংক্রান্ত সকল গবেষণায় এই ভিত্তিতে হিসেবে ধরা হয়েছে। এর ঠিক চার বছর পর ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ ডক্টরস স্টাডি নামক আরেকটি গবেষণা প্রকাশ করা হয়, যা চল্লিশ হাজার ডাক্তারের কুড়ি বছর ধরে করা গবেষণার ফলাফল। সেখানে ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুসের সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
যারা প্রতিদিন ধূমপান করে না তাদেরকে ‘অকেশনাল স্মোকার’ হিসেবে ধরা হয়। ২০০৬ সালে ইউরোপীয় গবেষণায় দেখা যায় এই ধরনের ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাবনা অধূমপায়ীদের তুলনায় ১.২৪ গুণ বেশি।
পরোক্ষ ধূমপান বলতে সিগারেট, পাইপ বা চুরুটের পুড়ন্ত প্রান্ত থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ধূমপায়ীর ফুসফুস থেকে নির্গত ধোঁয়াকে বোঝায়। যে সকল ব্যক্তি গৃহে ও কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার তাদের হৃদরোগের সম্ভাবনা ২৫-৩০ শতাংশ ও ফুসফুস ক্যানসারের সম্ভাবনা ২০-৩০ শতাংশ বাড়ে। পরোক্ষ ধূমপানের জন্য প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৩৮,০০০ লোক মারা যায় যার মধ্যে ৩,৪০০ জন ফুসফুস ক্যানসারে মারা যান।
বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞগণ ধূমপান করাকে নির্ভরশীলতার দিক থেকে ৩য়, শারীরিক ক্ষতির দিক থেকে ১৪তম ও সামাজিক ক্ষতির দিক থেকে ১২তম হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ধূমপানের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড। এতে হার্ট অ্যাটাক, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ, এমফাইসিমা, ও ক্যানসার বিশেষত ফুসফুস, ল্যারিংস, মুখগহ্বর ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘকাল ধূমপানের ফলে সার্বিক গড় আয়ু অধূমপায়ীদের তুলনায় ১০ বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত হ্রাস পায়। দীর্ঘকালব্যাপী ধূমপায়ী পুরুষদের প্রায় অর্ধাংশ ধূমপানজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে।
ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুস ক্যানসারের একটি বড় ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষ ধূমপায়ীর ক্ষেত্রে সারাজীবনে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১৭.২ শতাংশ। যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এটি ১১.৬ শতাংশ। অধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক কম যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে ১.৩ শতাংশ, নারীর ক্ষেত্রে ১.৪ শতাংশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ফুসফুস ক্যানসারকে বিরল একটি রোগ হিসেবে মনে করা হত এবং এমনও বলা হত যে কোনো কোনো চিকিৎসক তার পেশাগত জীবনে হয়ত এই ধরনের ফুসফুস ক্যানসার এর রোগীর দেখাই পাবেন না। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ধূমপানের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ফুসফুস ক্যানসার ধীরে ধীরে মহামারি রূপ নিতে শুরু করে।
একজন ব্যক্তির রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সেই ব্যক্তি কতদিন ধরে ও দৈনিক কতটি ধূমপান করে তার সাথে সরাসরি সমানুপাতিক। তবে কেউ যদি ধূমপান পরিত্যাগ করে, তবে ঝুঁকি ক্রমশ কমে আসে। কারণ মানব শরীর ধূমপানজনিত ক্ষতি ধীরে ধীরে মেরামত করে নিতে পারে। ধূমপান ত্যাগ করার একবছর পরে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যারা ধূমপান চালিয়ে যায় তাদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে যায়।
সকল ধূমপায়ীর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি সমান নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে কতটুকু তামাক সেবন করা হচ্ছে তার উপর। যারা বেশি ধূমপান করবে তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। তথাকথিত ‘লাইট সিগারেট’ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক নয়।
প্রতিবছর শুধু ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এটি প্রতিরোধ যোগ্য অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ ও নারী ধূমপায়ীরা গড়ে তাদের জীবনের যথাক্রমে ১৩ ও ১৪ বছর হারান। বলা হয়ে থাকে, একটি সিগারেট গড়ে প্রায় এগারো মিনিট আয়ু কমিয়ে দেয়। সারাজীবন ধরে ধূমপানকারীর মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকজন ধূমপানের ক্ষতির কারণে মারা যায়। অধূমপায়ীর তুলনায় একজন ধূমপায়ীর ৬০ বা ৭০ বছর বয়সের পূর্বে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় তিনগুণ।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম