শীতের শুরু থেকে গরম আসা পর্যন্ত দেশি ফলের মধ্যে বাজারে কমবেশি নানা রকম কুল বা বরই পাওয়া যায়। বরই অনেক প্রকারের হলেও প্রধানত দেশি টক বরই ও মিষ্টি কুল অন্যতম। এছাড়া বাজারে টক মিষ্টি গোল বরই, নারকেল কুল, আপেল কুল, বাও কুল ইত্যাদি পাওয়া যায়।
বরই এর রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। তুলনামূলক দামও হাতের নাগালে থাকায় সর্বসাধারণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে বরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মোটামুটি প্রতি ১০০ গ্রাম কুলে রয়েছে খাদ্যশক্তি ৭৯ কিলোক্যালরি, শর্করা ২০.২৩ গ্রাম, আমিষ ১.২ গ্রাম, পানি ৭৭.৮৬ গ্রাম, খাদ্যআঁশ ১০ গ্রাম, ভিটামিন এ ৪০ আই ইউ, থায়ামিন ০.০২ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লোবিন ০.০৪ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ৬ ০.০৮১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৬৯ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ২১ মিলিগ্রাম, লোহা ০.৪৮ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১০ মিলিগ্রাম, ম্যাংগানিজ ০.০৮৪ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ২৩ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ২৫০ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৩ মিলিগ্রাম, জিংক ০.০৫ মিলিগ্রাম।
বরই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস সমৃদ্ধ। যা হৃদ্রোগ এবং ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য রোগ প্রতিরোধ করে। এছাড়া এই ফল যকৃতের নানা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং যকৃতের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
বরইয়ে থাকা বিভিন্ন কেমিক্যাল অনিদ্রাজনিত সমস্যা ও দুশ্চিন্তা দূর করতে সাহায্য করে। বরইয়ে থাকা প্রয়োজনীয় পটাশিয়াম শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য ঠিক রাখে। শুকনো কিংবা কাঁচা বরই উভয়েই শরীরের প্রদাহ উপশম করতে ভূমিকা রাখে।
বরই চর্বিহীন ও আঁশ জাতীয় খাবার হওয়ায় ওজন কমানোর জন্য বরই খাওয়া যায়। পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বরই অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। বরই গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের বিরুদ্ধে কাজ করে। তবে খালি পেটে অথবা একসাথে অনেক পরিমাণে বরই খেলে তা অ্যাসিডিটি অথবা বদহজমের কারণ হতে পারে।
বরই স্নায়ুতন্ত্র সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই ফলে থাকা স্যাপোনিন নামক পদার্থ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ব্রেন ফাংশন ভালো করতে বরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বরই ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন ও ফসফরাস সমৃদ্ধ তাই বরই খেলে হাড় ও দাঁত মজবুত হয়। এছাড়া বরই দাঁতের ও মাড়ির অর্থাৎ মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। বরই রক্ত বিশুদ্ধকারক হিসেবে কাজ করে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য টক বরই উপকারী।
তবে একসাথে অনেকগুলো মিষ্টি বরই খেলে ডায়াবেটিস রোগীর সুগার বেড়ে যেতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীকে অবশ্যই তার অবস্থা জেনে বুঝে মিষ্টি বড়ই খেতে হবে। আর যাঁদের শ্বাসকষ্ট আছে, কাঁচা বরই বেশি খেয়ে ফেললে তাঁদের এ সমস্যা কিন্তু বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষেত্রে বরই অনেক সময় বিপরীতমুখী ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। তাই ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার সময় বরই এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
যেহেতু বরইয়ে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেলস এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, তাই বরই খেলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। ফলে এটি সংক্রামক রোগ যেমন– টনসিলাইটিস, ঠোঁটের কোণে ঘা, জিহ্বায় ঘা ইত্যাদি দূর করে। এছাড়াও মৌসুমি জ্বর, সর্দি-কাশিও প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি হজমশক্তি বৃদ্ধি ও খাবারে রুচি ফিরাতে সাহায্য করে।
আবার ত্বকের রুক্ষতা দূর করে ত্বককে কোমল করে তুলতে সহায়ক হতে পারে বরই। বরই বুড়িয়ে যাওয়া ঠেকায় ও শরীরে বয়সের ছাপ পড়তে বাধা দেয়।
বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় ও সব ধরনের মাটিতে বরই জন্মে। বরই শুকিয়ে অনেক দিন সংরক্ষণ করা যায়। কাঁচা ও শুকনো বরই দিয়ে চমৎকার চাটনি ও আচার তৈরি করা যায়।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


কেমন হবে চাকরিজীবীদের ডায়েট?
বয়স যখন ৪০ ছুঁই ছুঁই...
লম্বা সময় না খেয়ে মস্তিষ্কের যে ক্ষতি করছেন
