প্রতিহিংসাপরায়ণতা সাধারণত রাগ, হতাশা অথবা ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের অংশ হিসেবে দেখা দিতে পারে। তবে কিছু মানসিক ব্যাধিতে এটি চরম আকার ধারণ করতে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যকে ক্ষতি করার পরিকল্পনা করতে পারে। নিচে এমন কিছু মানসিক ব্যাধি নিয়ে আলোচনা করা হলো যেখানে অতিরিক্ত প্রতিহিংসাপরায়ণতা লক্ষ করা যায়:
অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (ASPD)
লক্ষণ
১. অন্যের প্রতি সহানুভূতির অভাব।
২. নৈতিকতা বা আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা।
৩. প্রতারণামূলক ও শোষণমূলক আচরণ।
৪. প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা।
অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় অন্যের ক্ষতি করার মধ্য দিয়ে আনন্দ অনুভব করতে পারেন। তারা পরিকল্পিতভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যদি তারা মনে করে যে, কেউ তাদের অসম্মান করেছে বা তাদের বিরুদ্ধে গেছে।
নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD)
লক্ষণ
১. নিজের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা।
২. নিজের সমালোচনা সহ্য করতে না পারা।
৩. প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ (বিশেষ করে অপমানিত বোধ করলে)।
৪. অন্যের প্রতি সহানুভূতির অভাব থাকা।
নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি মনে করেন, যে কেউ তার সম্মানহানি করেছে বা তার মর্যাদার ওপর আঘাত এনেছে, তবে সে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে। এই প্রতিহিংসা মানসিক হয়েও প্রকাশ পেতে পারে, আবার শারীরিকও হতে পারে।
প্যারানয়েড পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (PPD)
লক্ষণ
১. অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা।
২. অন্যদের প্রতি অবিশ্বাস।
৩. নিজের ক্ষোভ পুষে রাখা এবং প্রতিশোধের পরিকল্পনা করা।
৪. নিজেকে সবসময় শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত ভাবতে থাকা।
প্যারানয়েড পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই মনে করে যে, অন্যরা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এ কারণে তারা অন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করতে পারে, যদিও বাস্তবে তেমন কিছু ঘটে না।
বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (BPD)
লক্ষণ
১. আবেগের চরম ওঠানামা।
২. সম্পর্কের প্রতি অতি-নির্ভরশীলতা এবং সন্দেহপ্রবণতা।
৩. প্রত্যাখ্যাত বা অবহেলিত হলে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে যাওয়া।
৪. আত্ম-ধ্বংসাত্মক বা আক্রমণাত্মক আচরণ।
বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যদি মনে করে যে, কেউ তাদের ছেড়ে যাচ্ছে বা অবহেলা করছে, তবে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে পারে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যকে আঘাত করতে পারে, এমনকি আত্ম-ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার (IED)
লক্ষণ
১. হঠাৎ করে চরম রাগের বিস্ফোরণ।
২. ধ্বংসাত্মক এবং সহিংস প্রতিক্রিয়া।
৩. ঘটনার তুলনায় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেওয়া।
৪. পরে অনুশোচনা হলেও একই আচরণ পুনরাবৃত্তি করা।
ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় ক্ষুদ্র বিষয়েও তীব্র প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে। এটি একবার ঘটলে পুনরায় ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) – সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে
লক্ষণ
১. অতীতের কোনো ট্রমার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা।
২. অতি-সতর্কতা এবং শত্রুতা অনুভব করা।
৩. হিংস্র দুঃস্বপ্ন বা ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ।
৪. নিজেকে বা অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে আগ্রাসী হয়ে ওঠা।
পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত কেউ যদি মনে করে যে, তার ওপর অন্যায় হয়েছে এবং সে সুবিচার পায়নি, তবে সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তীব্র মানসিক চাপ অনুভব করতে পারে এবং কখনো কখনো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
অতিরিক্ত প্রতিহিংসাপরায়ণতা মানসিক সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের প্রবণতা দেখা দিলে দ্রুত মানসিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক থেরাপি ও সহানুভূতিশীল মনোযোগের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহিংসতা ও প্রতিশোধপরায়ণতা হিংসাত্মক মনোভাব কমিয়ে আনা সম্ভব, প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হতে পারে কখনও কখনও কিন্তু কার্যকরী।
লেখক: সাইকোলজিস্ট, শান্তিবাড়ী