ডায়াবেটিস রোগীর করোনা হলে করণীয়

২০১৯ সালের শেষদিক থেকে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) বিশ্বজুড়ে মানবজীবনে এক মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছিল। ২০২৫ সালে করোনাভাইরাস আবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে। এই ভাইরাস সাধারণত সকল মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ হলেও যাদের পূর্ব থেকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা রয়েছে, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্য এই রোগ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে যেকোনো সংক্রমণ, বিশেষ করে ভাইরাসজনিত রোগে তাদের জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় ডায়াবেটিস থাকলে যেসব ঝুঁকি বাড়ে তা হল–

১. করোনা সংক্রমণের সময় শরীরের হরমোন পরিবর্তনের ফলে রক্তে গ্লুকোজ হঠাৎ বেড়ে বা কমে যায়, যা স্বাভাবিক সময়ের মতো ওষুধ বা ইনসুলিন প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসাপদ্ধতি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।

২. টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ডায়াবেটিস বেড়ে গিয়ে কিটোঅ্যাসিডোসিস (Diabetic Ketoacidosis) দেখা যায়, যা মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হতে পারে।

৩. ডায়াবেটিস রোগীদের করোনা হলে বহু অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া ফুসফুস, কিডনি ও হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে।

৪. পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীদের মৃত্যুহার অনেক বেশি।

যেহেতু ডায়াবেটিস রোগীর করোনায় সংক্রমিত হলে বিভিন্ন রকম জটিলতা, হাসপাতাল ভর্তি এবং মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই করোনা হলে ডায়াবেটিস রোগীর তাৎক্ষণিক করণীয় হল–

১. স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী উপসর্গ দেখা দিলে (জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, স্বাদ-ঘ্রাণ চলে যাওয়া, ক্লান্তি ইত্যাদি) দ্রুত করোনা পরীক্ষা করা।

২. তাছাড়া পরিবার থেকে আলাদা হয়ে ঘরে আইসোলেশনে থাকতে হবে। একটি নির্দিষ্ট ঘরে থাকা, ব্যক্তিগত পাত্রে খাওয়া, আলাদা টয়লেট ব্যবহার করাই উত্তম।

৩. করোনা হলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে বা কমে যেতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ৪-৬ বার গ্লুকোজ চেক করতে হবে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ বার অক্সিমিটার দিয়ে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মাপতে হবে। ৯৪ শতাংশের নিচে নামলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৪. ইনসুলিন বা ওষুধের নিয়ম মেনে চলা, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ পরিবর্তন করা যাবে না। ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের জন্য ডোজ অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।

৫. ডায়াবেটিস ও করোনা—দুই অবস্থায়ই রোগীর জন্য সঠিক খাবার গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস ও করোনার কথা মাথায় রেখে সুষম ও সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। যেমন- জটিল শর্করা যেমন ব্রাউন রাইস, ওটস, লাল আটা। প্রোটিন হিসাবে ডিম, কম মসলাযুক্ত সিদ্ধ মুরগি/মাছ, ডাল। সবজি হিসাবে পেঁপে, লাউ, চালকুমড়া, পটল, করল্লা, ঝিঙে ভালো। ফলের ভিতর কম মিষ্টি ফল যেমন আমড়া, আপেল, পেয়ারার অল্প পরিমাণ খাওয়া উচিত।

৬. বেশি ক্যালোরি, চিনি বা ফ্যাটযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে যেমন চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয়, ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত লবণ ও তেলযুক্ত খাবার।

৭. পানি ও তরল গ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ শরীর হাইড্রেটেড রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন ৮–১০ গ্লাস পানি, কচি ডাবের পানি, স্যুপ, লেবু-পানি ইত্যাদি পান করা যেতে পারে।

৮. প্রতিদিন ৫–৬ টি মিল গ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি মিলে অল্প করে সুষম খাবার খাওয়া উচিত।

৯. শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে। খুব বেশি কাজ না করে দিনে অন্তত ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম জরুরি। তাবে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্য হালকা হাঁটাচলা, ব্যায়াম, মেডিটেশন করা যেতে পারে।

১০. করোনায় আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে যে সকল উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, সেগুলো হলো রক্তে শর্করার মাত্রা ২৫০ mg/dl এর ওপরে বা ৭০ mg/dl এর নিচে নেমে গেলে, শ্বাসকষ্ট বা অক্সিজেন কমে গেলে, হঠাৎ অজ্ঞান হলে বা বিভ্রান্ত লাগলে, প্রস্রাবে কিটোন পাওয়া গেলে।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য করোনাভাইরাস অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তাই সঠিক সচেতনতা এবং সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণই পারে একজন ডায়াবেটিস রোগীকে করোনার জটিলতা থেকে রক্ষা করতে।

লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি।