বর্ষার আগমন আর মেঘলা আকাশ যেমন স্বস্তি নিয়ে আসে, তেমনি সঙ্গে করে নিয়ে আসে নানা রোগব্যাধির শঙ্কা। আমাদের দেশের আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রীষ্মকাল, বর্ষা ও শরৎকালে জ্বরজারির প্রাদুর্ভাব হয়। বর্তমানে জ্বর, সর্দি-কাশির মতো সাধারণ উপসর্গগুলোও জনমনে ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মূল কারণ হলো মৌসুমি ফ্লু বা সাধারণ ঠান্ডা-কাশির পাশাপাশি- দেশে কোভিড-১৯, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগগুলোর প্রকোপ রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, সাধারণ জ্বর কতটুকু সাধারণ? না কী জ্বর মানেই কি করোনা বা ডেঙ্গু? কিংবা দুটি রোগ কি একইসঙ্গে শরীরকে আক্রান্ত করতে পারে?
জ্বরের কারণ নানাবিধ
জ্বর মূলত শরীরের একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া, যা বিভিন্ন সংক্রমণের ফলে হতে পারে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, ফাঙ্গাস—যে কোনো সংক্রমণেই জ্বর দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে এই সময়ে সবচেয়ে বেশি যে জ্বর দেখা যায় তা সাধারণত মৌসুমি ফ্লু বা ভাইরাল ফিভার। এছাড়া রয়েছে এডিস মশাবাহিত- ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও জিকা। পাশাপাশি করোনার একটি ভ্যারিয়েন্ট দেশে ছড়াচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআরবি।
এই তিনটি রোগেই জ্বর সাধারণ উপসর্গ। তবে কিছু পার্থক্য রয়েছে:
- করোনাভাইরাস: সাধারণত জ্বর, শুকনো কাশি, গলাব্যথা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও কখনো স্বাদ-গন্ধ হারানো ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। কোভিড-১৯ এর নতুন ভ্যারিয়েন্টগুলোর উপসর্গ আগের মতোই রয়ে গেছে, যার মধ্যে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা এবং দুর্বলতার মতো লক্ষণগুলোই প্রধান। তবে অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো এতটাই মৃদু থাকে যে, আক্রান্ত ব্যক্তি তা বুঝতেই পারেন না, যা নীরবে সংক্রমণ ছড়াতে সাহায্য করে।
- ডেঙ্গু: এই রোগে সাধারণত তীব্র জ্বর (১০২-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট), অসহ্য গা-ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা যায়। প্লাজমা লিকেজ হয়ে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও থাকে।
- চিকনগুনিয়া: এক্ষেত্রে জ্বর, তীব্র গেঁটে ব্যথা, র্যাশ, মাথাব্যথা ও অবসাদ দেখা দিতে পারে। তবে তীব্র জ্বরের সঙ্গে হাড়ের জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা থাকে, যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভোগাতে পারে।
উপসর্গে মিল থাকায় অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তাই অনেকক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।
একসঙ্গে একাধিক সংক্রমণ সম্ভব?
হ্যাঁ, একই ব্যক্তি একসঙ্গে ডেঙ্গু ও করোনা বা চিকনগুনিয়া ও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন, একে বলে কো-ইনফেকশন। এ ধরনের কো-ইনফেকশন রোগীর শরীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং জটিলতা বাড়াতে পারে। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু ও কোভিডের কো-ইনফেকশনের রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল। একই সময়ে একাধিক ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে তা শরীরের বিভিন্ন ‘ভাইটাল অর্গান'- এর কার্যক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যা থেকে নিউমোনিয়া, হার্ট ফেইলিউর, কিডনি ফেইলিউর-সহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই, এই ধরনের অবস্থায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা আরও সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়।
- জ্বর হলে দিনের পর দিন- ঘরোয়া চিকিৎসায় না গিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- জ্বর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে উন্নতি না হলে- পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত করতে হবে এটি ভাইরাল ফিভার, ডেঙ্গু, করোনা না চিকনগুনিয়া।
- যে কোন জ্বরে পানিশূন্যতা রোধে পর্যাপ্ত পানি ও স্যালাইন খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে।
- ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধের একমাত্র উপায় এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচা। সে জন্য দিনে-রাতে ঘুমানোর সময়ে মশারি বা রিপেলেন্ট স্প্রে ব্যবহার করতে হবে। তিন দিনে একদিন জমা পানি ফেলে দিতে হবে।
- মাস্ক ব্যবহার ও হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।
- ডায়াবেটিস, কিডনি রোগে আক্রান্ত, ক্যান্সারের রোগী বা যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন- তাদের ক্ষেত্রে নিতে হবে আলাদা সতর্কতা।
তাই জ্বর দেখা দিলে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক পর্যবেক্ষণ, সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মনে রাখতে হবে, করোনা, ডেঙ্গু বা চিকনগুনিয়া একইসাথে হওয়া যদিও বিরল, কিন্তু অসম্ভব নয়। সচেতনতা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। মশা নিয়ন্ত্রণ ও কোভিড সুরক্ষাবিধি মেনে চলার মাধ্যমে আমরা এই তিন রোগেরই বিস্তার রোধ করতে পারি। সুস্থ ও সতর্ক থাকতে পারি।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএমইউ