বাংলাদেশে বর্ষা এলেই বাড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। বছর বছর এই ভাইরাসজনিত রোগটি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তবে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে রয়েছেন যারা আগে থেকেই নানা ধরনের জটিল রোগে ভুগছেন, বিশেষ করে হার্টের রোগীরা।
হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সাধারণ রোগীদের তুলনায় জটিলতা বেশি হয়। তাই তাদের জন্য চাই বাড়তি সতর্কতা, সঠিক চিকিৎসা, আর সময়মতো সিদ্ধান্ত।
ডেঙ্গুতে শরীরের রক্তের প্লেটলেট সংখ্যা কমে যায়, রক্তচাপ পড়ে যায় এবং কখনো কখনো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। হৃদরোগের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে, যাঁদের কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিউর, কার্ডিওমায়োপ্যাথি, কিংবা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন রয়েছে, তাঁদের জন্য ডেঙ্গু অতিরিক্ত হৃৎপিণ্ডের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে, যা হার্ট ফেলিউরের আশঙ্কা তৈরি করে। আবার অতিরিক্ত তরল দিলে হার্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে চিকিৎসায় ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত জরুরি।
উপসর্গে বিভ্রান্তি হতে পারে
ডেঙ্গুর উপসর্গ যেমন জ্বর, বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট কিংবা ঘামের সঙ্গে হৃদরোগের উপসর্গ মিল থাকায় অনেক সময় রোগী বা স্বজনরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। আবার হৃদরোগীদের ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফলাফল অনেক সময় ভিন্ন হতে পারে, যা চিকিৎসকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
করণীয়
হার্টের রেগী যদি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, তবে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:
চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন:
নিয়মিত কার্ডিওলজিস্ট ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্লেটলেট কাউন্ট, হিমাটোক্রিট, ইলেক্ট্রোলাইট ও হার্ট ফাংশন নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
তরল গ্রহণে ভারসাম্য:
পানিশূন্যতা রোধ করতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে হবে, তবে হার্ট ফেলিউর থাকলে অতিরিক্ত তরল বিপজ্জনক হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্যালাইন বা ওরস্যালাইন গ্রহণ করবেন না।ৎ
ওষুধ ব্যবস্থাপনা:
ডেঙ্গু রোগীরা অনেক সময় পেইন কিলার হিসেবে NSAIDs (যেমন: ইবুপ্রোফেন) খেয়ে থাকেন, যা হৃদরোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এমন ওষুধ গ্রহণে অবশ্যই চিকিৎসকের অনুমতি নিতে হবে।
বিশ্রাম ও পর্যবেক্ষণ:
ডেঙ্গু আক্রান্ত হৃদরোগীর বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ ও নিঃশ্বাসের হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
প্লেটলেট কাউন্ট কমলেও আতঙ্ক নয়:
অনেক সময় হৃদরোগের রোগী প্লেটলেট সংখ্যা কমে গেলে ভয় পেয়ে যান। মনে রাখতে হবে, সংখ্যা নয়—রোগীর উপসর্গ ও অবস্থাই চিকিৎসা নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
ডেঙ্গু এখন রোজকার ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। তাই হার্টের রোগীদের অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে:
১. ঘরে মশারি ব্যবহার করুন।
২. বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখুন।
৩. জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলুন।
৪. খেয়াল রাখুন ফুলের টব, প্লাস্টিক, পরিত্যক্ত টায়ার, এসি ট্রে—এসব জায়গায় যেন পানি না জমে।
৫. প্রতি সপ্তাহে একদিন ‘ঝাড়ু দিবস’ পালন করুন।
হৃদরোগীদের জন্য ডেঙ্গু কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, সচেতন থাকলেই রক্ষা পাওয়া যায়। ডেঙ্গুতে ভয় নয়—সতর্কতাই হোক বাঁচার পথ।
লেখক: মিনিম্যালি ইনভেসিভ কার্ডিয়াক অ্যান্ড এওর্টিক সার্জন, জাতীয় হৃদ্রোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল।