থ্যালাসেমিয়া এক ধরনের বংশগত রক্তরোগ, এর ফলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের গঠন এবং উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। হিমোগ্লোবিন হলো একটি প্রোটিন, যা লোহিত রক্তকণিকায় থাকে এবং এটি ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে থ্যালাসেমিয়া কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে এই রোগের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
থ্যালাসেমিয়া মূলত দুই প্রকার:
১. আলফা থ্যালাসেমিয়া
এই রোগে হিমোগ্লোবিনের ‘আলফা গ্লোবিন চেইন’ তৈরিতে সমস্যা দেখা দেয়। এই ধরণটি সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়।
২. বেটা থ্যালাসেমিয়া
এতে হিমোগ্লোবিনের ‘বেটা গ্লোবিন চেইন’ উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এটি বেশি প্রচলিত। বেটা থ্যালাসেমিয়া আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত:
১. থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বা মাইনর: উপসর্গ থাকে না বা খুব হালকা।
২. থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া: মাঝারি মাত্রার লক্ষণ।
৩. থ্যালাসেমিয়া মেজর: মারাত্মক ধরনের; নিয়মিত রক্তসঞ্চালনের প্রয়োজন হয়।
থ্যালাসেমিয়ার সাধারণ উপসর্গ
১. রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)।
২. ক্লান্তি ও দুর্বলতা।
৩. হাড় ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা।
৪. তিল বা স্প্লিনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।
৫. মুখমণ্ডলের পরিবর্তন (বিশেষ করে বাচ্চাদের)।
৬. বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া।
৭. গা-হলুদ ভাব (জন্ডিস)।
৮. ঘন ঘন ইনফেকশন।
১. রক্তসঞ্চালন : থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের নিয়মিত রক্ত দিতে হয়।
২. লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধিকারী ওষুধ।
৩. হাড়ের মজ্জা প্রতিস্থাপন : একমাত্র সম্ভাব্য স্থায়ী চিকিৎসা।
৪. লোহা অপসারণ থেরাপি : বারবার রক্ত দেওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত লোহা জমে যায়, যা অপসারণের জন্য এই থেরাপি করা হয়।
থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্যতালিকা রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাদ্য ব্যবস্থাপনায় যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ তা হলো:
১. লো-আয়রন ডায়েট গ্রহণ করতে হবে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের শরীরে অতিরিক্ত লোহার প্রবণতা থাকে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত রক্তসঞ্চালন নেন। অতিরিক্ত লোহার ফলে হার্ট, লিভার ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতি হতে পারে। লোহার উৎস যেসব খাবার এড়াতে হবে: লাল মাংস (গরু, খাসি), কলিজা, কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ডিমের কুসুম, গুড়, মল্টেড সিরিয়াল, আয়রন-ফর্টিফায়েড ফুড, অতিরিক্ত ভিটামিন সি (কারণ এটি আয়রন শোষণ বাড়ায়)।
২. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। থ্যালাসেমিয়ায় হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড়ের গঠন ও স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই সুপারিশকৃত খাবারগুলো হল: দুধ, টক দই, ছানা, কালচে শাক (পালং, কলমি, লাল শাক), ছোট মাছ, সূর্যের আলো (ভিটামিন ডি এর জন্য)।
৩. ফোলেটসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে, যা রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। ফলেটের উৎস হলো মসুর ডাল, ছোলা, পালংশাক, ঢেঁড়স, কলা, কমলা, ব্রকলি।
৪. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার ডায়েটে থাকা জরুরি। যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে, যা থ্যালাসেমিয়ায় ঘন ঘন দেখা যায়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার যেমন বেরি জাতীয় ফল (স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি), ভিটামিন ই (বাদাম, সূর্যমুখী তেল), ভিটামিন সি (সীমিত মাত্রায়), গাজর, বিট, টমেটো ইত্যাদি।
৫. পর্যাপ্ত পানি ও হাইড্রেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত সঞ্চালন এবং কিডনির কার্যকারিতা ঠিক রাখার জন্য প্রচুর পানি পান করা উচিত।
৬. যে সকল খাবার সীমিত বা এড়িয়ে চলা উচিত এবং তা হলো: গরুর মাংস, কলিজায় অতিরিক্ত আয়রন থাকে, আয়রন-ফর্টিফায়েড সিরিয়ালে অতিরিক্ত আয়রন ডোম, ডার্ক চকোলেটে লোহার পরিমাণ বেশি থাকে, ড্রাই ফ্রুটসে (কিসমিস, খেজুর) লোহার ঘনত্ব বেশি, অতিরিক্ত ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট লোহার শোষণ বাড়ায়।
থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট ব্যবস্থাপনা জরুরী। যেমন:
১. জিংক সাপ্লিমেন্ট: রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
২. ভিটামিন ই ও সি: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
৩. ফোলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট: হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে।
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে পুষ্টি নির্দেশনা, যা শিশুদের জন্য পুষ্টি ঘাটতি রোধ করে:
১. আয়রনবিহীন উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার যেমন ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, দুধ।
২. শিশুদের বৃদ্ধি মনিটরিং।
৩. খেলার মাধ্যমে হাড় মজবুত রাখার অভ্যাস।
পিতামাতা, অভিভাবক ও পরিচর্যাকারীর জন্য পরামর্শ:
বংশগত রোগ বলে এই রোগে সচেতনতা ও বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার চিহ্নিতকরণে স্কুল, কলেজ পর্যায়ে স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া রক্তদান এবং রক্তদাতার নিরাপদ উৎস নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
থ্যালাসেমিয়া একটি আজীবন বয়ে বেড়ানো রোগ হলেও সঠিক চিকিৎসা এবং পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়। একজন পুষ্টিবিদ রোগীর শরীরের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত খাদ্য পরিকল্পনা করে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। সর্বোপরি, সচেতনতা, সঠিক সময়ে নির্ণয় ও নিয়মিত চিকিৎসা এই রোগ থেকে সুস্থ জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি