রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ছে অ্যানথ্রাক্স। পশুবাহিত এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ জন হলেও স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে ১৫ জনেরও বেশি আক্রান্ত অ্যানথ্রাক্সে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি গরু জবাই ও রান্নার কাজে সম্পৃক্ত নারীরাও রয়েছেন। চিকিৎসা পেতে হয়রানি এবং পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ অনেকের।
মিঠাপুকুর উপজেলার ইমাদপুর ইউনিয়নের আমাইপুর, দুর্গাপুর ও তরফসাদি গ্রামে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের অনেকে এখনো গ্রাম্য চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকেই লোকলজ্জা ও আতঙ্কে আক্রান্তের বিষয়টি প্রকাশ করছেন না।
গত সপ্তাহে সরেজমিনে আমাইপুর গ্রামে দেখা যায়, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত কয়েকজন গ্রামবাসী শরীরের ক্ষত নিয়ে ঘরেই থাকছেন। কারও হাতের আঙুলে, কারও আবার কোমড় ও পিঠে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো চিকিৎসক এখনো তাদের খোঁজ নিতে আসেননি।
আক্রান্ত এক গৃহিণী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওই গোছ (মাংস) বাড়িত আনি এই অবস্থা। খুব ব্যথা করে, পচে যাচ্ছে। কোনো ডাক্তার আইসে নাই। হামরা গরিব মানুষ, এতো ট্যাকা কই থেইক পাই?’
একই গ্রামের আরও দুজনের শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষত দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ ও পাউডার ব্যবহার করছেন তাঁরা। গ্রামবাসীর অনেকে শরীরে চুলকানি ও ক্ষত নিয়ে আতঙ্কে আছেন।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে আমাইপুর গ্রামে অসুস্থ একটি গরু দ্রুত জবাই করে কম দামে বিক্রি করা হয়। গরু জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের শরীরে প্রথম অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরবর্তীতে ওই মাংস রান্না করার কাজে সম্পৃক্ত কয়েকজন নারীও আক্রান্ত হন।
ইমাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স মোকাবিলায় প্রতি ওয়ার্ডে একজন ইমাম, ইউপি সদস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রতিনিধিকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যাতে কেউ অসুস্থ গরু জবাই করতে না পারে।’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে এই উদ্যোগের বাস্তব প্রয়োগ এখনো চোখে পড়ছে না। আক্রান্তরা ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না এবং অনেকে লোকলজ্জায় বিষয়টি গোপন করছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত টিকা কার্যক্রম বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সময় মতো সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং টিকা কার্যক্রম সীমিত থাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে।
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. এম এ হালিম লাবলু বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ছয়জনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে একজনের অ্যানথ্রাক্স পজিটিভ এসেছে। আরও কয়েকজনের মধ্যে উপসর্গ রয়েছে। আমরা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছি এবং সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছি।’
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলতাব হোসেন বলেন, ‘উপজেলায় গবাদিপশুর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। সরকারি ভাবে আমরা মাত্র ৩৪ হাজার গবাদিপশুর জন্য টিকা বরাদ্দ পেয়েছি, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সচেতনতা বৃদ্ধি ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১১ জন অ্যানথ্রাক্স উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পীরগাছায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে।