হামের প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে কেড়ে নিয়েছে ৪৩৯ শিশুর জীবন। মার্চ থেকে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৬১ হাজারের বেশি শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নানা উদ্যোগের পরও কেন কমানো যাচ্ছে না মৃত্যু- এ প্রশ্ন সবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিক সময়ে হাসপাতালে না আসায় বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। এছাড়া পুষ্টির অভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে বেশির ভাগ শিশু।
বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের অনেককেই দেরিতে হাসপাতালে নিয়ে আসায় বাড়ছে মৃত্যুহার। তবে হাসপাতালে পৌঁছেও বেড পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন অনেকে।
সরেজমিনে গিয়ে এমনই এক হামে আক্রান্ত শিশুর দেখা মিলল রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। ১০ মাস বয়সী তাবাসসুমকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যখন মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পৌঁছাল, ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন দুপুর দুইটা।
স্বজনরা জানালেন, আগারগাঁওয়ের শিশু হাসপাতাল, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও তাবাসসুমের জন্য মেলেনি একটি বেড। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশু তাবাসসুমকে ভোলা থেকে ঢাকায় আনা হয় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু এখানে এসেও ছুটতে হচ্ছে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে।
দেরিতে হাসপাতালে নিয়ে আসা, কিংবা বেড সংকট- কারণ যেটাই হোক, দেরিতে চিকিৎসা শুরুর কারণে হামে শিশুমৃত্যু বাড়ছে বলেই জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বলেন, 'রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকার জন্য আমাদের চিকিৎসাটা তাদের (রোগীদের) মধ্যে রেসপন্স করছে না। দেখা যায় যে, আমরা হয়তো উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি, চিকিৎসা দিচ্ছি। কিন্তু তার শরীরে যেহেতু ইমিউনিটি একদম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়, তখন দেখা যায় যে, আমরা যে চিকিৎসাই দেই না কেন, তাদের শরীর রেসপন্স করে না।'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে শিশুরা। মুখের ভেতরে ক্ষত তৈরি হওয়ায় কিছু খেতে পারে না।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও এবং হাম রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান ডা.খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, 'বাচ্চাগুলোর সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হচ্ছে, যার জন্য ডায়রিয়া হচ্ছে, যার জন্য তার নিউমোনিয়া হচ্ছে। কোনো কোনো সময় দেখবেন মুখের মধ্যে সাদা সাদা হয়ে যাচ্ছে, তার মানে কী, তার ফাংগাস ইনফেকশনও হচ্ছে। মুখে যখন ফাংগাল ইনফেকশন হয়, বাচ্চাতো সাকও করতে পারে না, তাই না। বাচ্চা কিছু খেতেও পারে না। তো এই সমস্ত কিছু নিয়ে ওই বাচ্চাটার ইমিউনিটি স্ট্যাটাসটা এত বেশি ডাউন হয় যে, আলটিমেটলি সে কিন্তু ওই ভাইরাসের কাছে পরাজিত হয় এবং সে মারা যায়।'
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা.ফাহমিদা খানম জানান, আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের জন্য কতগুলো লিম্ফোয়েড অর্গান আছে, যেমন গলার মধ্যে টনসিল। কিন্তু হামের যখনই জীবাণুটা হয়, আমাদের লিম্ফোয়েড অর্গানগুলোকে সে অ্যাফেক্ট (প্রভাবিত) করে। সেক্ষেত্রে আমাদের বডিতে যে মেমোরি সেল আছে, আগের মেমরি আছে যে, সে রোগটাকে চিনবে- সে কিন্তু আর চিনতে পারে না।
গবেষণা বলছে, শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ অপুষ্টি। তাই জীবন রক্ষায় টিকার পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির দিকেও নজর দেওয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।