বিরল ও প্রাণঘাতী সিস্টিক ফাইব্রোসিস (সিএফ) রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ শুরু করল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। সোমবার টঙ্গীর কাঁঠালদিয়া এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কারখানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সাউথ আফ্রিকাসহ ছয়টি দেশের রোগী ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে ওষুধটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেশন অফিসার রাব্বুর রেজা উপস্থিত থেকে তাদের হাতে ওষুধ হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘রাইট টু ব্রিদ’-এর প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা জানান, বেক্সিমকো ফার্মা ‘ট্রিকো’ নামে ইলেক্সাক্যাফটর, টেজাক্যাফটর ও আইভাক্যাফটরের সমন্বয়ে তৈরি ওষুধ বাজারে এনেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের উদ্ভাবিত ‘ট্রিকাফটা’-এর জেনেরিক সংস্করণ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জীবনরক্ষাকারী অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ ওষুধটি বিশ্বের হাজারো সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাবে।
বেক্সিমকো ফার্মার জেনেরিক সংস্করণ ট্রিকোর বার্ষিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ হাজার ৭৫০ ডলার এবং শিশুদের জন্য ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার, যা মূল ওষুধের যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কম। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ব্র্যান্ডেড ওষুধে একজন শিশুর চিকিৎসার খরচে ট্রিকোর মাধ্যমে ৫৮ জন শিশুর চিকিৎসা সম্ভব।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ‘বেক্সডেকো’ নামে আইভাক্যাফটরের জেনেরিক সংস্করণও বাজারে এনেছে। এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ট্যাবলেট ৫ ডলার।
প্রাথমিক পর্যায়ে ‘সিএফ বায়ার্স ক্লাব’-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট রোগীদের কাছে ওষুধ সরবরাহ করা হবে। পরবর্তীতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবঞ্চিত রোগীদের কাছে এ চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাব্বুর রেজা বলেন, ‘বেক্সিমকো ফার্মা সবসময়ই রোগীদের অপূর্ণ চিকিৎসা চাহিদা পূরণে কাজ করে আসছে, বিশেষ করে যেসব রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এই অর্থবহ উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। আমাদের বিশ্বাস, এই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সহজলভ্য হওয়ায় সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত হাজারো রোগীর জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, যারা এতদিন উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আমাদের এ উদ্যোগ কমার্সিয়াল নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ যাত্রা শুরু হয়েছে। বিশ্ববাজারে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ এ ওষুধ রোগীদের রোগ সারাতে কাজ করবে বলে আমরা আশা করছি।
সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের একটি জোটের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ওয়াশিংটনের সিয়াটলে অনুষ্ঠিত নর্থ আমেরিকান সিস্টিক ফাইব্রোসিস কনফারেন্সে (এনএসিএফসি) এই উদ্যোগটি সর্বসমক্ষে ঘোষণা করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি বেক্সিমকো ফার্মা কর্তৃক সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
জানা গেছে, সিস্টিক ফাইব্রোসিস একটি বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী বংশগত রোগ। এতে ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রে ঘন শ্লেষ্মা জমে শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। এখন পর্যন্ত, এই রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই অল্প বয়সে মারা যান। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। আরও প্রায় ৮০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়নি, যাদের ৮২ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করে।
ট্রিকাফটা সিস্টিক ফাইব্রোসিস চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এবং রোগীদের আয়ু বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধটির মাধ্যমে বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় ৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার হওয়ায় অধিকাংশ রোগীর জন্য এটি নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এমনকি পেটেন্ট সুরক্ষার কারণে এখন পর্যন্ত এর কোনো জেনেরিক সংস্করণ নেই।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ এলডিসিভুক্ত দেশগুলো ওষুধের পেটেন্ট সুরক্ষা কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পায়। এর ফলে বেক্সিমকো ফার্মা আইনগতভাবে পেটেন্টধারী যে কোনো ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদন করতে পারে। সিস্টিক ফাইব্রোসিসের এই সাশ্রয়ী চিকিৎসা উদ্যোগও সেই সুযোগের ভিত্তিতেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।