মা–বাবার যে ভুলে শিশু লম্বা হচ্ছে না

স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে খেয়াল করেছেন কখনো? একই শ্রেণির বা একই বয়সের বিভিন্ন শিশুর উচ্চতা অন্যদের চেয়ে অনেক কম। আপনার নিজের সন্তানকে দেখেও কি কখনো মনে হয়েছে, শিশুটি কেন লম্বা হচ্ছে না?

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশের লাখ লাখ শিশু তাদের সম্ভাব্য স্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারছে না। আর এর পেছনে বংশগতির চেয়েও বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে দৈনন্দিন কিছু ভুল অভ্যাস ও সচেতনতার অভাব। বাংলাদেশের শিশুরা কেন কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পাচ্ছে না এবং কোন ভুলগুলো শুধরে নিলে সন্তানের সঠিক শারীরিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব, তা আলোচনা করা হলো।

শিশুদের লম্বা না হওয়ার কারণ

আমাদের দেশের শিশুরা কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা না পাওয়ার পেছনে মূল কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা:

১. দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি বা স্টান্টিং: শিশুদের লম্বা না হওয়ার প্রথম ও প্রধান কারণ স্টান্টিং। দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পুষ্টির ঘাটতি থাকলে শিশুর ওজন যেমন বাড়ে না, তেমনি উচ্চতা বৃদ্ধিও স্থায়ীভাবে আটকে যায়।

২. সুষম খাবারের অভাব: শিশু একটু বড় হলেই ঘরের সুষম খাবার—যেমন ভাত, ডাল, সবজি, মাছ ও মাংসের বদলে বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিপস, কৃত্রিম জুস বা ফাস্টফুডে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এসব খাবারে ক্যালরি থাকলেও হাড় বৃদ্ধির জন্য দরকারি ভিটামিন ও মিনারেলস থাকে না। দৈনন্দিন খাবারে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্যালরি শর্করা, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আমিষ এবং ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ চর্বি থেকে আসা প্রয়োজন, যা বেশিরভাগ শিশুই পায় না।

৩. অরুচি ও কোষ্ঠকাঠিন্য: শিশু না খেলে অনেক মা-বাবাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রুচির ওষুধ বা ভিটামিন সিরাপ খাওয়াতে শুরু করেন। কিন্তু অরুচি কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়, এটি শারীরিক সমস্যার উপসর্গমাত্র। শিশু কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলে বা নিয়মিত পেট পরিষ্কার না হলে পেটে গ্যাস তৈরি হয় এবং ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয়। পেটের সমস্যা দূর না হলে কোনো ভিটামিনেই শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি হবে না।

৪. হরমোন ও ভিটামিন ডি-র অভাব: মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি থাকলে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি থাইরয়েড সমস্যা বা পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ার কারণে ভিটামিন ডি-র অভাবেও শিশুদের হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে যায়।

মা-বাবার বড় ভুল

আমাদের দেশে মা-বাবারা সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন একদম শেষ সময়ে। সন্তান যখন ১৪ বা ১৫ বছর পার করে ফেলে, তখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, সাধারণত ১৩ বছরের পর মেয়েদের এবং ১৫ বছরের পর ছেলেদের উচ্চতা বৃদ্ধির সুযোগ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ এ বয়সে হাড়ের ‘গ্রোথ প্লেট’ জোড়া লেগে যায়। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি থাকলে তার চিকিৎসা ১০ বছর বয়সের আগেই শুরু করা জরুরি। সঠিক বয়স পার হয়ে গেলে পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসাতেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না।

সন্তানের স্বাভাবিক উচ্চতা নিশ্চিত করতে করণীয়

সন্তান যেন তার বংশগত সম্ভাবনার সর্বোচ্চ উচ্চতা পেতে পারে, সে জন্য শৈশব থেকেই কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি:

    জন্মের পর সঠিক পুষ্টি: প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ এবং এরপর ঘরের তৈরি পুষ্টিকর ও সুষম অতিরিক্ত খাবার দিতে হবে।

    সূর্যালোক ও খেলাধুলা: শিশুকে প্রতিদিন বিকেলে বা সকালে অন্তত কিছু সময় রোদে খেলাধুলা করতে দিন। এটি হাড় শক্ত করার প্রাকৃতিক ভিটামিন ডি সরবরাহ করে। স্ক্রিন টাইম বা মোবাইলের ব্যবহার কমিয়ে দৌড়াদৌড়ির অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

    উচ্চতা ট্র্যাক করা: প্রতি তিন মাস পর পর শিশুর উচ্চতা ও ওজন মেপে তা লিখে রাখুন। স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হলে শুরুতেই শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান।

    পেটের যত্ন: শিশু দুই বছর বয়সে পৌঁছালেই তাকে নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস করান, যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পুষ্টির ঘাটতি না তৈরি হয়।

    যত্রতত্র ওষুধ নয়: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রুচির সিরাপ বা অ্যান্টিবায়োটিক না খাইয়ে অরুচির মূল কারণ খুঁজে বের করে তার চিকিৎসা করান।

মনে রাখা প্রয়োজন, সব শিশুই নিজস্ব গতিতে বেড়ে ওঠে। তবে সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলে প্রতিটি শিশুই তার কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা ও সুস্থ জীবন পেতে পারে।