স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা মিশতে পারে। নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের সময় খাবারে সিসার পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে। বারবার ব্যবহারের পরও খাবারে সিসার উপস্থিতি নিরাপদ মাত্রার নিচে নামছে না।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি ন্যাচার গ্রুপের জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) আইসিডিডিআর,বি থেকে পাঠানো এক গবেষণা বিজ্ঞপ্তি এসব তথ্য জানানো হয়।
গবেষকেরা বলছেন, পুরোনো ভাঙারি ধাতু বা স্ক্র্যাপ মেটাল গলিয়ে স্থানীয়ভাবে অনেক অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র তৈরি করা হয়। এসব ধাতু যথাযথভাবে পরীক্ষা করা না হলে তৈরি পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। পরে এসব পাত্রে রান্না করা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এ ঝুঁকি উদ্বেগজনক। কারণ, সিসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের বদলে নতুন পাত্র কেনা কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে রান্নার পাত্র নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। গবেষণাটিতে সরাসরি এই বিনিময়প্রথা নিয়ে কাজ করা হয়নি। তবে গবেষণার ফলাফল বলছে, নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই একটি রান্নার পাত্র নিরাপদ এমনটি মনে করার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।
গবেষণায় স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে কতটা সিসা মিশতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবারের অম্লতা, পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতি এবং রান্নার ধরন সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবারের ব্যবহৃত সাতটি পুরোনো এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়। এরপর পাত্রগুলো গরম করে তাতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। সবশেষে পরীক্ষাগারে বিশেষ পদ্ধতিতে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষিত প্রতিটি পাত্র থেকেই রান্না করা খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। তুলনা হিসেবে, শিশু ও ছোট শিশুদের খাবারে সিসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্ধারিত সীমা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, রান্নার পাত্র এবং সেই পাত্রে রান্না করা খাবার দুটিতেই সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করেছেন তারা। এর মাধ্যমে প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের সিসার সংস্পর্শে আসার কারণ হতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
গবেষকেরা জানান, সময়ের সঙ্গে একই পাত্রে বারবার রান্না করলে খাবারে সিসার পরিমাণ কমে আসে। তবে, তা নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে আসে না। পুরোনো সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ব্যবহৃত পাত্র থেকেও খাবারে সিসা মিশতে পারে।
পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতির সঙ্গে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার সম্পর্কও পেয়েছেন গবেষকরা। নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। একইভাবে ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়লেও সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে গবেষকেরা একটি হিসাব করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত রেফারেন্স মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে। তবে, শিশুদের শরীরে সরাসরি পরীক্ষা চালিয়ে এ পরিমাণ নির্ণয় করা হয়নি। গবেষকেরা একটি হিসাবের মডেল ব্যবহার করে এ অনুমান করেছেন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, রান্নার পাত্র এবং সেই পাত্রে রান্না করা খাবার দুটিতেই সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করেছেন তারা। এর মাধ্যমে প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের সিসার সংস্পর্শে আসার কারণ হতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, পরিবারগুলো অনেক যত্ন নিয়ে প্রতিদিন ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে। সেই খাবারে রান্নার পাত্র থেকেই সিসা মিশছে কি না, তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা করতে দেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, বিশেষ করে ছোট শিশুদের খাবার তৈরির জন্য খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে পরীক্ষিত রান্নার পাত্র ব্যবহার করা উচিত। এসব পাত্র ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষা এড়িয়ে চলা এবং তাতে টক বা অম্লীয় খাবার রান্না না করাই ভালো। তবে মনে রাখতে হবে, এসব সতর্কতা দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করে না।
ড. জেনা ফরসিথ আরো বলেন, সিসা দেখা যায় না, এর কোনো গন্ধ বা স্বাদও নেই। তাই দেখতে একদম ভালো একটি পাত্র থেকেও পরিবারের খাবারে সিসা মিশতে পারে। সাধারণভাবে দেখে পরিবারের পক্ষে বোঝার কোনো উপায় নেই কোন পাত্রটি নিরাপদ।
গবেষকদের মতে, এ ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বাংলাদেশে সিসার সংস্পর্শে আসার বিভিন্ন উৎস রয়েছে। এর মধ্যে হলুদে সিসা মেশানোর ঘটনাও রয়েছে। রান্নার পাত্র থেকেও মানুষ সিসার সংস্পর্শে আসতে পারে। তাই এ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষকদের মতে, নিরাপদ রান্নার পাত্র নিশ্চিত করতে বিদ্যমান মান ও নীতিমালা পর্যালোচনা করা, স্ক্র্যাপ ধাতু পরীক্ষা করা এবং তৈরি পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার ও পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়াও জরুরি।
আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের প্রকল্প সমন্বয়ক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।’ এ জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে রান্নার পাত্রের জন্য সিসা-সংক্রান্ত নিরাপত্তা মান তৈরি ও কার্যকর করার অনুরোধ জানান।
ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সাশ্রয়ী দামের রান্নার পাত্র মানেই অনিরাপদ পাত্র হওয়া উচিত নয়। উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং যথাযথ তদারকির মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।’
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত ছোট পরিসরের গবেষণা। গবেষণায় শিশুদের সিসা গ্রহণের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা সরাসরি শিশুদের পরীক্ষা করে পাওয়া নয়; বরং একটি হিসাবের মডেলের মাধ্যমে অনুমান করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের রান্নার পাত্র এবং দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং সেন্টার অন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সহায়তায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।