সম্প্রতি ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে জনস্বাস্থ্য অধিপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার নামে করোনা বিষয়ক কিছু পরামর্শ। তিনি ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, এটি তার দেয়া পোস্ট নয়। এই পোস্টে যে পরামর্শগুলো দেয়া হয়েছে তার অর্ধেকই অসত্য, অবৈজ্ঞানিক।
করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে বাংলাদেশে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। কোভিড সংক্রান্ত আইইডিসিআরের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ের কারণে প্রচার পান তিনি। হয়ত সে কারণে করোনা বিষয়ক পরামর্শকে সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তার নামে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ফেইসবুক পোস্টটি।
করোনা অতিমারিতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানান ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভাইরালও হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়া তথ্যের পুরোটাই মিথ্যা। আবার কখনো দেখা যাচ্ছে আংশিক মিথ্যা। কখনো দেখা যাচ্ছে, কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আবার কখনোবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
ফেইসবুকে যে লেখাটি ভাইরাল হয়েছে তার শিরোনামটি বেশ আকর্ষণীয়। শিরোনামটি হলো- ''অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রীনা ফ্লোরার লেখাটি আমরা পুরোটাই পড়বো; সকলেই উপকৃত হবো''। শিরোনাম দেখে যে কেউই আগ্রহ নিয়ে লেখাটি পড়বেন। কিন্তু অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ইন্ডিপেনডেন্টকে জানান, এই ধরনের ফেইসবুক পোস্ট তিনি দেন নি। তার নামে যা প্রচার করা হচ্ছে সেটি তার দেয়া নয় এবং সেখানে কিছু অবৈজ্ঞানিক ও অসত্য কথাও আছে।
ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, সেই লেখায় কিছু সুন্দর কথা আছে। যেমন- ''আমাদেরেকও প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে অভিযোজিত করতে হবে। লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। আমাদের নিজেদেরও পরিবর্তন করতে হবে সময়ের সাথে সাথে। কিছু নিয়ম মেনে চললেই করোনার ভয়াবহতার মধ্যেও টিকে থাকা সম্ভব''- এই কথাগুলো সুন্দর। এই সুন্দর সূচনা বক্তব্য দিয়ে যে পরামর্শগুলো দেয়া হয়েছে তার অর্ধেকই অসত্য। এসব গুজবে কান না দেয়ার আহ্বানও তার।
ইন্ডিপেনডেন্টের পক্ষ থেকেও যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে যে তথ্যগুলো ওই ভাইরাল ফেইসবুক পোস্টে রয়েছে তা কতটা সত্য, কতটা মিথ্যা। এক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভাইরাল পোস্টের অনেক তথ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
ভাইরাল পরামর্শের প্রথমটিতে এক জায়গায় বলা হয়েছে, ২০০৩ এ জাপানে সার্স ভাইরাসের মহামারির পর তাদের মধ্যে এই অভ্যেস গুলা গড়ে উঠেছিল, যা আজ খুব ভাল কাজ করছে ইমিউনিটি বৃদ্ধি করতে। কিন্তু এই তথ্যটি মিথ্যা বলেই ইন্ডিপেনডেন্টের কাছে প্রতিয়মান হয়েছে। কেনোনা সার্স মহামারীর শুরু হয় চীনে। ২৭টি ভূখণ্ডে এটি ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে জাপান নেই। অথচ সেই ভাইরাল পোস্টে জাপানের কথা বলা হয়েছে। সূত্র: World Health Organization. 21 April 2004. Archived
ভাইরাল পরামর্শের দ্বিতীয়টি পরিবেশ সংক্রান্ত। সেখানে বলা হয়েছে- ''আমরা খুব ভাগ্যবান যে আমরা এমন পরিবেশে আছি । নয়ত এই ঘনবসতি দেশ কবেই শেষ হয়ে যেত। আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রা খুব ভাল কাজ করছে । আর্দ্রতা বেশি থাকা মানে বাতাসে ধুলাবালি কম উড়বে । শীতে আর্দ্রতা কম থাকে, চারিদিক শুষ্ক থাকে বলে বেশি ধুলা ওড়ে । এজন্য শীত প্রধান দেশে এই ভাইরাস হানা দিচ্ছে বেশি।''
এখানে যা বলা হয়েছে সেই তথ্যগুলো করোনার শুরুর সময়ে অনেকে দিতেন। বলতেন, গরমকালে করোনা ভাইরাস মরে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা গেলো শীতকালেই করোনার বিস্তার কম ছিলো এবং গরম যত বাড়ছে করোনার প্রকোপও বাড়ছে। ভাইরাল ওই পোস্ট থেকে অনেকেই ভুল বুঝতে পারেন যে- গরমকালে করোনা ছড়ায় না। ফলে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উদাসীন হতে পারেন।
এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, যেহেতু ভাইরাসটি নতুন, সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা এখনো সম্ভব নয় যে, গরম- স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এই ভাইরাস বাঁচেনা । বরঞ্চ এখন পর্যন্ত যেসব প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে রয়েছে, তাতে যে কোনো জায়গায়, যে কোনো আবহাওয়াতেই কোভিড-১৯ ভাইরাস বিস্তারের ক্ষমতা রাখে। সুতরাং, ডব্লিইএইচও বলছে, গরম পড়লেও আপনার উচিৎ হবে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করা। এই বিষয়টি নিয়ে বিবিসিও একটি রিপোর্ট করে যার লিংক https://www.bbc.com/bengali/news-52049521।
ভাইরাল সেই পোস্টে তিন নম্বর পরামর্শে গিয়ে বলা হয়েছে, হার্ড ইমিউনিটির বিকল্প নাই। আমাদের ইমিউনিটি বুস্ট করতেই হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব সেই কথাগুলোই বলা হয়েছে। এসব পরামর্শ প্রসঙ্গে ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, 'অনেক পরামর্শই অবৈজ্ঞানিক। যদি বৈজ্ঞানিক হতই তাহলে যিনি এসব লিখেছেন তিনি নিজের নামে চালাতেন। কিন্তু তা না করে আমার নামে চালাচ্ছেন। এ থেকেই প্রমাণিত হয় সেখানে অনেক অবৈজ্ঞানিক কথা রয়েছে।'
করোনা ভাইরাস ছড়ানোর পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে শুরু হয়ে গেছে নানা ধরণের গুজব। আর এই গুজব ভাইরাসের চেয়ে বেশি দ্রুত ছড়ানোয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রবণতার নাম দিয়েছে ইনফোডেমিক। আর এই জন্য ইন্টারনেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিকে গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইনডোমিক বিষয়ে জানতে হলে যেতে পরেন https://www.who.int/health-topics/infodemic#tab=tab_1 এই লিংকে।
/এসএম আতিক/