ডেঙ্গু জ্বর
ডেঙ্গু জ্বর এডিস মশা দ্বারা ছড়ায়। এডিস মশার কামড়ে ভাইরাস সংক্রমণের তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেয়। জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংশপেশিতে ব্যথা এবং শরীরের নানা স্থানে র্যাশ ওঠাই ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ।
ডেঙ্গু হলো ডেঙ্গু ভাইরাস (DENV) দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ, যার বাহক এডিস মশা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ১০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় ব্যথার ওষুধ দিয়ে ডেঙ্গুর চিকিৎসা করা হয়।
এডিস মশা
এডিস মশা দেখতে অন্যান্য মশার মতো নয়। এদের দেহে ও পায়ে কালো এবং সাদা দাগ থাকে। তাই এডিস মশা খুব সহজে চেনা যায়। এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। এই মশা সাধারণত মানুষের পায়েই কামড়ায়। কারণ, বেশির ভাগ সময় মানুষের পায়ের অংশ অনাবৃত থাকে। তবে পা ছাড়া শরীরের অন্য অংশেও এই মশা কামড়াতে পারে।
ডেঙ্গুজ্বর কখন হয়
সাধারণত মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে এই জ্বরে তেমন কেউ আক্রান্ত হয় না। পুরোনো টায়ার, লন্ড্রি ট্যাংক, ঢাকনাবিহীন চৌবাচ্চা, ড্রাম, পোষা প্রাণীর পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনে ফেলে রাখা বোতল ও টিনের ক্যান, বাঁশ, দেয়ালে ঝুলে থাকা বোতল, পুরোনো জুতা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত খেলনা, ছাদে, বাগান পরিচর্যার জিনিসপত্র, ইটের গর্ত ও অপরিচ্ছন্ন সুইমিং পুলে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়। এই মশা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তবে ধরন পাল্টানো এডিস মশা অপরিচ্ছন্ন পানিতেও ডিম ছাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যা দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে। আগে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এডিস মশা কামড়ালেও এখন দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই এ মশা কামড়ায়।
প্লাটিলেট
ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলে এর সাথে হাত ধরেই আসেই প্লাটিলেট নিয়ে সংকট।প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা রক্তেরই অংশ। অনুচক্রিকা আমাদের শরীরের রক্ষক্ষরণ প্রতিরোধ করে। সাধারণত মানুষের রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা প্রতি ১০০ মিলিলিটারে দেড় থেকে চার লাখের মধ্যে থাকাটা স্বাভাবিক। ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেটের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। এতে রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে নেমে গেলে শরীরে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই প্লাটিলেট কমে যায় কেন? এর পেছনে তিনটি কারণ আছে। প্রথমত, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বোনমেরোর ওপর চাপ পড়ে। ফলে প্লাটিলেট উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয়ত, ডেঙ্গুআক্রান্ত রক্তকণিকা প্লাটিলেট ধ্বংস করে। আক্রান্ত রক্তকণিকার সংখ্যা যত বাড়ে প্লাটিলেট তত দ্রুত কমে। তৃতীয়ত, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শরীরে সংশ্লিষ্ট ভাইরাস ধ্বংসের জন্য নিজে থেকেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা প্রচুর পরিমাণে প্লাটিলেট ধ্বংস করে।
কখন বুঝবেন ডেঙ্গু
১. ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ জ্বর। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এ সময় শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এর সঙ্গে দেখা দিতে পারে বমি, মাথাব্যথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা। ডেঙ্গু জ্বর শরীরকে অনেক বেশি দুর্বল করে দেয়।
২. ডেঙ্গুর হিমোরোজিক ফিভারের কারণে অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়। ৪-৫ দিন পর শরীরে র্যাশ বের হয়। এ ছাড়া দাঁত ব্রাশ করলে রক্তক্ষরণ হয়, নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অনেক সময় প্রস্রাব-পায়খানার সঙ্গেও রক্ত যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ডকালীন রক্তক্ষরণ স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে হয়।
৩. তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে রক্তের পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো। অবহেলা না করে সবসময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের পরামর্শ হলো-এ সময়ে জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করুন।
ডেঙ্গু জ্বরে করণীয়
১. সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হয়। বিশ্রাম ছাড়া ডেঙ্গু থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। এ সময় বেশি কাজ করলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।
২. জ্বর হলে খাবার গ্রহণে অরুচি হওয়াটা স্বাভাবিক। এই সময়টাতে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খেতে হবে। যেমন: ডাবের পানি, ফলের জুস, লেবুর শরবত, খাবার স্যালাইন ইত্যাদি। স্ট্রিট ফুড বা ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার; অর্থাৎ, জাঙ্কফুড এড়িয়ে চলতে হবে।
৩. ডেঙ্গুজ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। কিন্তু যারা হার্ট এবং কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন, তাদের প্যারাসিটামল খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।
৪. সংক্রমণ প্রতিরোধে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। মশারির বাইরে বের হলে ফুল হাতা পোশাক পরতে হবে। মোট কথা মশার কামড় থেকে ডেঙ্গুরোগী ও অন্যদেরও বাঁচাতে হবে, যাতে ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকানো যায়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরবাড়ির আশপাশে ডাবের খোল, ক্যান, টায়ার, ফুলের টবে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে।
৫. জ্বর ছাড়ার ৪ থেকে ৫ দিনের মাথায় শরীরে র্যাশ, এলার্জি বা ঘামাচির মতো হতে পারে। জ্বর কমার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র পেট ব্যথা, ক্রমাগত বমি, নাক বা দাঁতের মাড়িতে রক্তক্ষরণ হলে, যকৃত বড় হয়ে গেলে, রক্তবমি হলে, মল কালো হলে কিংবা প্রসাব কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
৬. ডেঙ্গুতে অনেকেই প্লাটিলেটের হিসাব নিয়ে চিন্তায় থাকেন। প্লাটিলেট নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না করে তা চিকিৎসকের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বরে হাসপাতালে কখন ভর্তি হতে হয়?
ডেঙ্গু জ্বরের তিনটি ভাগ রয়েছে। এ ভাগগুলো হচ্ছে- এ, বি এবং সি। প্রথম ক্যাটাগরির রোগীরা স্বাভাবিক থাকে। তাদের শুধু জ্বর থাকে। তাদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই। বি ক্যাটাগরির ডেঙ্গু রোগীদের সবই স্বাভাবিক থাকে। শুধু শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন: পেট ব্যথা, বমি ইত্যাদি। আবার দুদিন জ্বরের পর শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই ভালো। আর সি ক্যাটাগরির ডেঙ্গু জ্বর সবচেয়ে খারাপ। এ ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউর প্রয়োজন পর্যন্ত হতে পারে।
গর্ভের সন্তান আক্রান্ত হয়?
গর্ভবতী নারী আক্রান্ত হলে গর্ভের সন্তান ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয় না। তবে গর্ভকালে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বেশি সর্তক থাকা উচিত। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাতে পারেন। কারণ, মায়ের বুকের দুধের সঙ্গে এই জীবাণু ছড়ায় না।
শিশুদের ডেঙ্গু হলে করণীয়
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম। তাই ডেঙ্গু জ্বরে তাদের ওপর অনেক বেশি প্রভাব পড়ে। শিশুদের ডেঙ্গুর উপসর্গ বড়দের মতো নাও হতে পারে। তার পক্ষে সব সমস্যার কথা মুখে প্রকাশ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এই সময় অনেক শিশুর খাওয়া কমে যায়। যেসব শিশু স্কুলে যায়, তারা বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে।
শিশুদের ডেঙ্গুর লক্ষণ হুবহু না হলেও অনেকটা বড়দের মতোই হয়। জ্বর, মাথা, চোখ, পেট ব্যথা, বমির ভাব কিংবা খাবারে অরুচি, ডায়রিয়া ইত্যাদি হলে সতর্ক হতে হবে। সাধারণত মশা কামড়ানোর ৩ থেকে ১০ দিনের ভেতর রোগের লক্ষণগুলো দেখা দেয়। এই সময় শিশুকে মশারির ভেতর রাখা উচিত। এই সময়ে তাদের ঘন ঘন তরল খাবার দিতে হবে। পানি, লেবু, ফলের শরবত, স্যালাইন, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে দিতে হবে। কোনো শিশু ছয় ঘণ্টার ভেতর একবারও প্রস্রাব না করলে সে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। শিশুর প্রস্রাব কম হলে, হাত পা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা হয়ে গেলে শিশুর শক সিনড্রোম হতে পারে। এ সময় চিকিৎসক বা হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে থাকা খুব জরুরি।