মানুষ কত দিন বাঁচবে, এই প্রশ্নটা প্রায় সবার মনেই আসে। কেউ বলেন, সবই ভাগ্যের ব্যাপার। আবার কেউ মনে করেন, জীবনযাপনই আসল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আমাদের আয়ু কি অনেকটাই জিনের হাতেই লেখা?
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মানুষের আয়ু নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে জীবনযাপন। কী খাচ্ছেন, কতটা হাঁটছেন, ধূমপান বা মদ্যপান করছেন কি না, এসবই নাকি ঠিক করে দেয় কত দিন বাঁচবেন। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, জিনের প্রভাব এত দিন যতটা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের আয়ু নির্ধারণে জিনের ভূমিকা ৫০ শতাংশেরও বেশি। আগের ধারণার তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ আপনি কত দিন বাঁচবেন, তার অর্ধেকের বেশি তথ্য হয়তো আপনার শরীরের ভেতর জন্মের সময়ই লেখা থাকে।
এই ফলাফল শুনে খুব একটা অবাক হননি স্ট্যানফোর্ড লংজেভিটি সেন্টারের সহপরিচালক ডেবোরাহ কাদো। তিনি বলেন, ‘পরিবারের দিকে তাকালেই বিষয়টা বোঝা যায়। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সবাই তুলনামূলক দীর্ঘায়ু।’ যদিও তিনি এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।
গবেষকেরা বলছেন, আগের গবেষণাগুলোতে জিনের ভূমিকা কম ধরা পড়েছিল। কারণ সেসব গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন উনিশ শতকের আগের মানুষজন। তখন সংক্রামক রোগ, দুর্ঘটনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষ অল্প বয়সেই মারা যেতেন। টিকা, আধুনিক চিকিৎসা বা নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় জিনের প্রভাব সেখানে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
এই নতুন গবেষণার প্রধান লেখক ইসরায়েলের ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের গবেষক উরি আলোন বলেন, ‘যখন এসব বাহ্যিক কারণ বাদ দেওয়া হয়, তখন জিনের আসল প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’ তার ভাষায়, ‘আমাদের জিনের ভেতর এক ধরনের সম্ভাব্য আয়ু লেখা থাকে।’
তবে এখানেই শেষ নয়। গবেষকেরা পরিষ্কার করে বলছেন, জিনই সব নয়। গড়ে একজন মানুষের আয়ুর প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো নির্ভর করে জীবনযাপন ও পরিবেশের ওপর। উরি আলোন বলেন, ‘এর কিছুটা ভাগ্য, আর কিছুটা আমাদের নিজের সিদ্ধান্ত।’
ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সম্পর্ক, এই বিষয়গুলো জিনগত আয়ুর সীমা পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়াতে বা কমাতে পারে। অর্থাৎ কারও জিন যদি বলে ৮০ বছর, ভালো অভ্যাসে তিনি ৮৫ বছরও বাঁচতে পারেন। আবার অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সেই আয়ু নেমে আসতে পারে ৭৫-এ।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, ভালো অভ্যাস করলেই সবাই ১০০ বছর বাঁচবেন, এমনটা নয়। উরি আলোনের কথায়, ‘যদি জিনে ৮০ লেখা থাকে, তাহলে সেটাকে ১০০ করা সম্ভব নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দেশটিতে গড় আয়ু দাঁড়িয়েছে ৭৯ বছর। কোভিড মহামারির সময় এই সংখ্যা কমে গেলেও ধীরে ধীরে আবার বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে পাওয়া নানা ‘লংজেভিটি প্রোডাক্ট’ বা অলৌকিক সমাধান আসলে দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি নয়।
জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যান আরকিং বলেন, ‘শুধু বেশি দিন বাঁচা নয়, সুস্থভাবে বাঁচাটাই আসল।’ তার মতে, ‘দীর্ঘ সময় অসুস্থ থেকে বেঁচে থাকার চেয়ে কম সময় সুস্থ থাকা অনেক বেশি মূল্যবান।’
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, আয়ু বাড়ানোর একটা প্রাকৃতিক সীমা থাকতে পারে। ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে বেঁচে থাকার রেকর্ড ১২২ বছর। এর বেশি বয়সে মানুষের আয়ু বাড়ানো আদৌ সম্ভব কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সব মিলিয়ে গবেষণা আমাদের কী শেখায়? জিন আমাদের আয়ুর একটা বড় অংশ নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু বাকি অংশটা এখনো আমাদের হাতেই। নিয়মিত হাঁটা, পরিমিত খাওয়া, মানসিক সুস্থতা আর সামাজিক বন্ধন, এই ছোট ছোট অভ্যাসই হয়তো আমাদের জিনের দেওয়া সীমার ভেতর সবচেয়ে ভালো জীবনটা উপহার দিতে পারে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু, কত দিন বাঁচবেন, তা নয়। প্রশ্নটা হলো, বেঁচে থাকার দিনগুলো কেমন হবে।