ক্যানসার গবেষণায় বড় সাফল্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়েই সারবে এ রোগ 

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করার পদ্ধতি ‘ইমিউনোথেরাপি’ এখন ক্যানসার আক্রান্তদের নতুন জীবন দিচ্ছে। প্রায় শত বছরের গবেষণার পর উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিতেই আস্থা রাখছেন অনেক চিকিৎসক।

২০০৮ সালে কোলন ক্যানসারের জন্য অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের ৭১ বছর বয়সী মরিন সিডেরিস। সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও প্রায় ১৪ বছর পর তিনি খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তবে এবার তাঁর চিকিৎসা ছিল একেবারেই ভিন্ন। নিউ ইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে প্রতি তিন সপ্তাহে মাত্র ৪৫ মিনিটে ‘দোস্তারলিমাব’ নামের একটি ইনফিউশন নিতেন তিনি।

এতে মাত্র চার মাসেই তাঁর টিউমার সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়। এর জন্য কোনো অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের প্রয়োজন হয়নি। সিডেরিসের ভাষায়, এটি ছিল ‘অবিশ্বাস্য ও কল্পবিজ্ঞানের’ মতো একটি ঘটনা।

সিডেরিসের মতো অনেক রোগীই এখন ইমিউনোথেরাপি নিচ্ছেন। এ পদ্ধতিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম এবং ক্যানসার পুরোপুরি নির্মূলের সম্ভাবনাও বেশি।

ইমিউনোথেরাপি যেভাবে কাজ করে

মানুষের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই বাইরের যেকোনো ক্ষতিকর কোষ শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু ক্যানসার কোষগুলো অনেক সময় শরীরের এই নজরদারি ফাঁকি দেয়। ইমিউনোথেরাপির লক্ষ্য হলো ক্যানসার কোষের সেই ছদ্মবেশ উন্মোচন করা, যাতে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেগুলোকে খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করতে পারে।

বর্তমানে দুই ধরনের ইমিউনোথেরাপি বেশি জনপ্রিয়:
১. সিএআর টি-সেল থেরাপি: এতে রোগীর রক্ত থেকে টি-সেল সংগ্রহ করে সেগুলোকে ল্যাবে শক্তিশালী করা হয় এবং পুনরায় শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এটি মূলত ব্লাড ক্যানসারের জন্য বেশি কার্যকর।
২. ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটরস: এই পদ্ধতিতে ওষুধের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিষ্ক্রিয়তা দূর করা হয়। ফলে টি-সেলগুলো ক্যানসার কোষকে শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে। ২০১৮ সালে এই উদ্ভাবনের জন্য বিজ্ঞানীরা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

সফলতা ও সীমাবদ্ধতা

ইমিউনোথেরাপির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। সব রোগীর শরীর এতে সমানভাবে সাড়া দেয় না। সাধারণত ২০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই এটি কার্যকর হয়। এ ছাড়া কারো কারো ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, ক্লান্তি বা ত্বকের সমস্যার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। গবেষকরা এখন ওষুধের পাশাপাশি ডায়েট, মাইক্রোবায়োম এবং অন্যান্য ওষুধের সমন্বয়ের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

ক্যানসার ভ্যাকসিনের সম্ভাবনা

গবেষকরা এখন ক্যানসার ভ্যাকসিনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। এটি প্রথাগত ভ্যাকসিনের মতো প্রতিরোধমূলক নয়, বরং চিকিৎসায় ব্যবহৃত হবে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের উপরিভাগের প্রোটিন চিনতে সহযোগিতা করাই এর লক্ষ্য। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিডনি ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা ভ্যাকসিন নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ক্যানসারমুক্ত ছিলেন।

ভবিষ্যতে হয়তো ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি দেওয়াটা সেকেলে হয়ে পড়বে। মরিন সিডেরিসের মতো রোগীরা সেই উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই সাক্ষী।

সূত্র: বিবিসি