অনেকেই আছেন, নিয়মিত ব্যায়াম করেন, হাঁটাহাঁটি করেন, এমনকি জিমেও যান। তারপরও শরীরের কোথাও না কোথাও ব্যথা থেকেই যায়। কখনো কোমর ব্যথা, কখনো ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, আবার কখনো কাঁধে টান। তখন আমরা ভাবি, ‘আরও স্ট্রেচিং করলে হয়তো ঠিক হবে’ বা ‘আজ একটু বেশি ব্যায়াম করলে ভালো লাগবে।’
কিন্তু সত্যি কথা হলো, সব সময় বেশি ব্যায়াম বা বেশি স্ট্রেচিং সমস্যার সমাধান নয়। অনেক সময় এর পেছনে লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য সমস্যা। যাকে বলা হয় মাসল কম্পেনসেশন।
এই বিষয়টি শুনতে একটু জটিল মনে হলেও, আসলে খুব সহজ। আজ সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক।
কী এই মাসল কম্পেনসেশন?
আমাদের শরীর একটি সমন্বিত সিস্টেমের মতো কাজ করে। একসঙ্গে বিভিন্ন মাংসপেশি, জয়েন্ট ও টিস্যু কাজ করে শরীরকে নড়াচড়া করায়। কিন্তু কোনো অংশ দুর্বল হয়ে পড়লে অন্য অংশ সেটার ঘাটতি পূরণ করতে এগিয়ে আসে।
যেমন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, খারাপ ভঙ্গি বা একই কাজ বারবার করলে শরীরের কিছু অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন অন্য কিছু মাংসপেশি বাড়তি কাজ নিতে শুরু করে। শুরুতে এটা শরীরকে সচল রাখতে সাহায্য করলেও, ধীরে ধীরে এটিই ব্যথা ও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোথা থেকে শুরু হয় সমস্যা?
ধরা যাক, আপনি অনেকক্ষণ বসে আছেন। এতে নিতম্বের পেশি (গ্লুটস) ও গভীর কোর দুর্বল হয়ে যায়। অন্যদিকে হিপ ফ্লেক্সর শক্ত হয়ে পড়ে। তখন হাঁটা, স্কোয়াট বা লাঞ্জ করার সময় কোমর ও হ্যামস্ট্রিং বাড়তি কাজ নেয়। ফলে কোমরে ব্যথা শুরু হয়।
আবার, ফোন বা কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকে থাকলে বুক ও পিঠের মাঝামাঝি অংশ শক্ত হয়ে যায়। তখন হাত ওপরে তুলতে গেলে ঘাড় ও কাঁধের পেশি অতিরিক্ত চাপ নেয়। এতে ঘাড়ে ব্যথা বাড়ে।
পুরোনো কোনো আঘাতও এই সমস্যার কারণ হতে পারে। যেমন, গোড়ালিতে মচকানো আঘাত ঠিকমতো না সারলে শরীরের ওজন অন্য পায়ে চলে যায়। এতে ধীরে ধীরে কোমর বা হাঁটুতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কেন এটি বিপজ্জনক?
প্রথমে এই ‘কম্পেনসেশন’ শরীরকে চলতে সাহায্য করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পেশি অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যেগুলো কাজ করার কথা, সেগুলো আরও দুর্বল হয়। শরীরে টান, অস্থিরতা ও ব্যথা তৈরি হয়। ফলে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
নিজেই কীভাবে বুঝবেন?
ব্যায়াম করার সময় নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখুন। যেমন, স্কোয়াট বা লাঞ্জে যদি নিতম্বের বদলে কোমর বা হ্যামস্ট্রিং বেশি কাজ করে। হাত ওপরে তুললে কাঁধ উঁচু হয়ে যায় বা ঘাড় শক্ত লাগে। কোর এক্সারসাইজে পেটের বদলে হিপ ফ্লেক্সরে চাপ লাগে। শরীরের এক পাশ অন্য পাশের তুলনায় বেশি কাজ করে। ব্যায়ামের পর কিছু পেশি অস্বাভাবিক বেশি ব্যথা করে। এসবই হতে পারে ‘কম্পেনসেশন প্যাটার্ন’-এর লক্ষণ।
সমাধান কী?
এই সমস্যা ঠিক করতে জটিল ব্যায়ামের দরকার নেই। বরং মূল বিষয় হলো সঠিকভাবে নড়াচড়া শেখা।
ধীরে ব্যায়াম করুন
তাড়াহুড়া না করে ধীরে ধীরে ব্যায়াম করলে বুঝতে পারবেন কোন পেশি কাজ করছে। এতে ভুল পেশির ওপর চাপ কমে।
শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক করুন
ঠিকভাবে শ্বাস নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। বুক ফুলিয়ে হালকা শ্বাস নিলে ঘাড় ও কাঁধের পেশি বেশি কাজ করে। বরং শ্বাস নেওয়ার সময় পাঁজরের পাশগুলো প্রসারিত করুন, আর ছাড়ার সময় ভেতরের দিকে টানুন। এতে কোর পেশি সক্রিয় হয়।
যেখানেই শক্ত, সেখানে কাজ করুন
শরীরের যেসব অংশ শক্ত হয়ে গেছে। যেমন, হিপ ফ্লেক্সর বা পিঠের মাঝামাঝি অংশ। সেগুলোর নমনীয়তা বাড়াতে কাজ করুন। এতে শরীরের ভারসাম্য ফিরে আসে।
মাসল কম্পেনসেশন মানে আপনার শরীর খারাপ, এমন নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, শরীর নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছে।
কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন এই মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন চলতে থাকে। তাই শুধু ব্যথার জায়গায় মনোযোগ না দিয়ে, পুরো শরীর কীভাবে কাজ করছে সেটি বোঝা জরুরি।
ব্যথার পেছনে ছুটে না বেড়িয়ে, সঠিকভাবে নড়াচড়া শেখার দিকে মন দিন। তবেই মিলবে দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি।