গরম বাড়ছে। দুপুরের রোদ যেন আগের চেয়ে আরও তীব্র। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন অভিভাবকেরা। শিশুরা বাইরে খেলতে যাবে কি না, রোদে গেলে অসুস্থ হবে কি না। অনেকেই তাই বাচ্চাদের ঘরের ভেতরেই আটকে রাখতে চান। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে দেখলে হবে না। শিশুদের সুস্থ বেড়ে ওঠার জন্য সূর্যের আলো, খোলা বাতাস এবং খেলাধুলাও জরুরি।
তবু গরমের এই সময়টায় একটি বিষয় নিয়ে সচেতন থাকা খুব প্রয়োজন। এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো হিট স্ট্রোক। সময়মতো লক্ষণ না বুঝলে এটি মারাত্মক হতে পারে। তাই হিট স্ট্রোক কী, কীভাবে বোঝা যাবে এবং কীভাবে প্রতিরোধ করবেন? এসব জানা জরুরি। বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন ফেলো অব ইন্ডিয়ান কলেজ অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের পেডিয়াট্রিক পালমোনোলজি ও পিআইসিইউয়ের পরিচালক ডা. রাজীব উত্তম।
হিট স্ট্রোক আসলে কী
হিট স্ট্রোক হলো তাপজনিত সবচেয়ে গুরুতর অসুস্থতা। যখন শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় এবং নিজে থেকে সেই তাপ কমাতে পারে না, তখন এই অবস্থা তৈরি হয়। সাধারণত দীর্ঘ সময় তীব্র গরমে থাকা, বেশি শারীরিক পরিশ্রম করা বা পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার কারণে এটি হয়।
চিকিৎসক ডা. রাজীব উত্তম বলেন, ‘হিট স্ট্রোকের সময় শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়ে যেতে পারে। তখন শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি, এমনকি জীবনহানিও হতে পারে।’
কেন শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
শিশুদের শরীর এখনও পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। তারা বড়দের মতো সহজে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আবার খেলতে গেলে তারা সময়ের হিসাবও রাখে না। ঘামছে কি না, ক্লান্ত হচ্ছে কি না, এসব খেয়াল করে না। ফলে তারা অজান্তেই দীর্ঘ সময় গরমে থাকে।
এ ছাড়া অনেক সময় বাচ্চারা পানি খেতে ভুলে যায় বা তৃষ্ণা পেলেও জানায় না। এসব কারণে তাদের শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। যা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
যেসব লক্ষণে বুঝবেন বিপদ আসছে
হিট স্ট্রোক হঠাৎ করে হলেও এর কিছু আগাম লক্ষণ থাকে। অভিভাবকদের সেগুলো খেয়াল করা জরুরি।
- শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি (৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি)।
- ত্বক লালচে, গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
- অনেক ক্ষেত্রে ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরা।
- বমিভাব বা বমি।
- দুর্বলতা, দাঁড়িয়ে থাকতে না পারা।
- দ্রুত হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস।
- বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ।
- খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
এই লক্ষণগুলোর যেকোনোটি দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেরি করলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো উপায়
হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। কিছু সহজ অভ্যাসই আপনার শিশুকে নিরাপদ রাখতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করান
গরমে শিশুকে বারবার পানি খেতে মনে করিয়ে দিন। শুধু তৃষ্ণা পেলেই নয়, নিয়মিত পানি খাওয়ানো দরকার। বাইরে গেলে অবশ্যই পানির বোতল দিন। প্রস্রাব কম হলে বা গাঢ় রঙের হলে বুঝবেন পানি কম খাচ্ছে। চিনিযুক্ত বা সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলাই ভালো। এগুলো শরীরকে আরও ডিহাইড্রেট করতে পারে।
রোদ এড়িয়ে চলুন
সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা, এই সময়টায় রোদ সবচেয়ে তীব্র থাকে। সম্ভব হলে এই সময় বাইরে না যাওয়াই ভালো। খেলাধুলা বা বাইরে যাওয়ার সময় সকালবেলা বা বিকেলের দিকে ঠিক করুন।
সানস্ক্রিন ব্যবহার
বাইরে গেলে শিশুদের ত্বক রক্ষা করা জরুরি। শিশুদের জন্য নিরাপদ সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন। বাইরে যাওয়ার অন্তত ২০-৩০ মিনিট আগে এটি লাগানো ভালো।
শরীর ঠান্ডা রাখুন
গরমে দিনে এক বা দুইবার গোসল করানো যেতে পারে। মাঝে মাঝে ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত, মুখ ধোয়া বা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিলে আরাম পায়।
সঠিক পোশাক
হালকা রঙের, ঢিলেঢালা ও সুতি কাপড় সবচেয়ে ভালো। এগুলো শরীরে বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং ঘাম শোষণ করে। মাথা ঢাকার জন্য টুপি ব্যবহার করানো যেতে পারে।
ঘর ঠান্ডা রাখুন
যতটা সম্ভব ঘর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন। ফ্যান বা এসি ব্যবহার করতে পারেন। জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়িতে একা রাখবেন না
গরমে পার্ক করা গাড়ির ভেতর খুব দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে যায়। কখনোই শিশুকে গাড়ির ভেতরে একা রেখে যাবেন না। অল্প সময়ের জন্যও না।
বিশ্রামের সময় দিন
গরমে শিশুরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই খেলাধুলার মাঝে বিশ্রামের সময় রাখা জরুরি। এতে শরীর স্বাভাবিক থাকতে পারে।
অসুস্থ মনে হলে কী করবেন
যদি মনে হয় শিশু হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে, তাহলে দ্রুত তাকে ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যান। অতিরিক্ত কাপড় খুলে দিন, শরীরে ঠান্ডা পানি লাগান এবং দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। দেরি না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাইরে খেলাধুলা কি বন্ধ রাখবেন?
অনেক অভিভাবক ভাবেন, গরমে বাচ্চাদের বাইরে খেলতে দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করাও ঠিক নয়। কারণ বাইরে খেলা, সূর্যালোক ও প্রকৃতির সংস্পর্শ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই সময়টা বেছে নিন। ভোরে বা বিকেলে স্বল্প সময়ের জন্য বাইরে খেলতে দিন। এতে শিশুরা সুস্থও থাকবে, আবার ঝুঁকিও কমবে।
সচেতন থাকলেই নিরাপদ
হিট স্ট্রোক ভয়ংকর হলেও সচেতন থাকলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। ছোট ছোট কিছু অভ্যাস যেমন, পানি খাওয়া, রোদ এড়িয়ে চলা ও সঠিক পোশাক। এসবই বড় সুরক্ষা দিতে পারে।
গরমের এই সময়ে তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। শিশুদের দিকে একটু বাড়তি নজর রাখলেই তারা থাকতে পারবে নিরাপদ, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে।



