গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহে যখন শহর-গ্রাম পুড়তে থাকে। তখন হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি যেন স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে। গরমে হাঁসফাঁস করা মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এই আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কিছু নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি। শিশু থেকে বয়স্ক, সবাই পড়তে পারেন ঝুঁকিতে।
তীব্র গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টি হলে পরিবেশের পাশাপাশি শরীরেও বেশকিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলেই দেখা দেয় নানা শারীরিক সমস্যা।
কেন সমস্যা হয়?
তাপপ্রবাহের সময় শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। হঠাৎ বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। এই দ্রুত ওঠানামা শরীরের স্বাভাবিক অভিযোজন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
একদিকে গরমে ঘাম ঝরার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বৃষ্টির পর বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
এ ছাড়া রাস্তায় জমে থাকা পানি, নোংরা পরিবেশ আর মশার বংশবিস্তার তো আছেই। সব মিলিয়ে ঝুঁকি যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে?
সর্দি-কাশি ও জ্বর: হঠাৎ ঠান্ডা-গরমের পরিবর্তনে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যায়। ফলে সর্দি, কাশি, জ্বর খুব সহজেই দেখা দিতে পারে। শিশু ও বয়স্করা এ ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
ভাইরাল সংক্রমণ: বৃষ্টির পর আর্দ্র পরিবেশ ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য করে। অনেকেই হঠাৎ করে ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হন।
ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ: বৃষ্টির পানি অনেক সময় ড্রেন বা নোংরা পানির সঙ্গে মিশে যায়। এতে পানি দূষিত হয় এবং ডায়রিয়া, আমাশয় বা অন্যান্য পেটের রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
ত্বকের সমস্যা: ঘাম, ভেজা কাপড় এবং আর্দ্র পরিবেশের কারণে ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চুলকানি বা র্যাশ হতে পারে।
মশাবাহিত রোগ: বৃষ্টির পানি জমে থাকলে মশার বংশবিস্তার বাড়ে। এতে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিশুদের জন্য বাড়তি সতর্কতা
শিশুরা আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না। তাই তাদের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। বৃষ্টিতে ভিজলে দ্রুত শুকনো কাপড় পরিয়ে দিন। ঠান্ডা লাগার লক্ষণ দেখলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পরিষ্কার পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করুন। শিশুদের ইমিউন সিস্টেম পুরোপুরি শক্তিশালী না হওয়ায় তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
খেয়ার রাখতে হবে বয়স্কদেরও
বয়স্কদের শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। অনেকেরই আগে থেকে নানা শারীরিক সমস্যা থাকে। তাই তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও জরুরি। হঠাৎ ঠান্ডা লাগা থেকে বাঁচতে হালকা গরম কাপড় ব্যবহার করতে পারেন। ভেজা পরিবেশে বেশি সময় যেন না থাকে সেদিকে খেয়ালা রাখুন। শ্বাসকষ্ট বা জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এই সময় কী করবেন?
- বৃষ্টিতে ভিজে থাকলে দ্রুত শুকনো কাপড় পরে নিন। ভেজা কাপড় বেশি সময় শরীরে থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে।
- এই সময়টাতে অবশ্যই ফুটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান করুন। বাইরে কোথাও পানি পান করার আগে সতর্ক থাকুন।
- বৃষ্টির সময়ে রাস্তার খাবার খেলে পেটের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
- বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকতে দেবেন না।
- হালকা বা দ্রুত শুকায় এমন কাপড় পরা ভালো। যেমন কটন বা সুতি কাপড় দ্রুত পানি শোষণ করে।
- জুতা হিসেবে এমন কিছু ব্যবহার করুন, যা সহজে শুকায় এবং কাদা বা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
- শরীরকে সুস্থ রাখতে পুষ্টিকর খাবার খান। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।
আবহাওয়া পরিবর্তন অনেক সময় মনের ওপরও প্রভাব ফেলে। ক্লান্তি, অস্থিরতা বা অলসতা অনুভব হতে পারে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, হালকা ব্যায়ামও করতে পারেন।
প্রকৃতির এই পরিবর্তন থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের যত্ন নিয়ে এর প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। তাই সচেতন থাকুন, সুস্থ রাখুন আপনার পরিবারকে।