সকল মায়ের প্রতি যত্নবান হোন

‘মা দিবসের’ প্রচলন প্রথম কবে শুরু হয়, তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেন প্রাচীন গ্রিসে। আবার কেউ বলেন ১৯১১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আমেরিকায় ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি বিশেষ দিন উদ্‌যাপিত হয়। পরে ১৯১৪ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এই দিবসটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। এখান থেকেই বৈশ্বিক চালচিত্রে মা দিবস উদ্‌যাপনের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। 

এ বছর মা দিবস উদ্‌যাপনে মা এবং সন্তানের বন্ধনকে কালাতীত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘Celebrating Motherhood: A Timeless Bond.’

এটুকু পর্যন্ত ঠিকই আছে। পাশ্চাত্য ঘেঁষে মা দিবসে মাকে ফুল, কার্ড, উপহার, কেক ইত্যাদি পাঠানোর চর্চা ও আমাদের সংস্কৃতিতে ক্রমশ গভীর হচ্ছে। কিন্তু একটা জিনিস আমাদের চোখের সামনে থাকার পরও আমরা সেটা গ্রহণ করছি না। এটা হলো, জীবন সীমিত করে দেওয়া নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত একটি শিশুর মায়ের মনটা কী বলে, যখন এমন মা দিবস আসে? ফেসবুকে নানা বয়সী মেয়েদের উচ্ছ্বসিত ছবিসহ উপহারের সর্বত্র উপস্থিতি! এই ‘মা’টি সেসব দেখে কেমন বোধ করেন? এই মা–কে কি কেউ কখনো বলেছেন, ‘তোমাকে মা দিবসের শুভেচ্ছা!’

খুব রক্ষণশীল হিসাবেও বর্তমানে বাংলাদেশের ৮০ হাজারের বেশি শিশু নিরাময় অযোগ্য রোগে ভুগছে। শিশুর সঙ্গে তার পরিবারও ভুগছে। এদের প্যালিয়েটিভ সেবা প্রায়োজন। এসব শিশুর জন্য সরকারি হিসাবে বিছানা ১০টিও নেই। যা আছে, সেটাও ঢাকাকেন্দ্রিক।

এই মায়েদের জন্য আমরা ভাবছি কী?

প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ কড়াইল বস্তিতে এমন ২৬টি নিরাময় অযোগ্য শিশুকে চিকিৎসা, ওষুধ, খাদ্যসহ ব্যক্তি বিশেষে প্রয়োজনীয় চাহিদানির্ভর সেবা দিচ্ছে। কিন্ত সেটা মহা সমুদ্রে এক ফোঁটা পানির সমতুল্য। 

প্রশ্ন হলো, আপনার–আমার বাসায় যে আগামীতে একটি নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত শিশুর প্যালিয়েটিভ সেবা প্রয়োজন হবে না, সেটা কি আমরা বুকে হাত রেখে বলতে পারি? যদি হয়, তখন কী করব?

সেই অনাগত মায়ের জীবনে আবার মা দিবস আসবে। আমরা কি পত্রিকায় লিখেই দায় শেষ করব?

নাকি আমরা স্বপ্ন দেখব আগামী ২০ বছরের মধ্যে ছোট্ট ছোট্ট করে এই মায়েদের জন্য আমরা কিছু করতে পারি। হয়তো কারও অর্থ প্রয়োজন নেই, শুধু একটু সময় দরকার। তাঁকে কি কিছুক্ষণ সময় দেওয়া যায়, যখন তিনি একটু বিশ্রাম নেবেন; অথবা ঘুরতে যাবেন? আমরা কি বলতে পারি এই শিশুটিকে আমরা দেখছি। বিত্তবানরা কি এ রকম একটি শিশুর যত্নে তাঁর মাসিক একবেলা রেস্টুরেন্টের খাবার খরচটা দিতে পারেন? আমাদের বাচ্চাদের আমরা কি শেখাতে পারি যে, তুমি এই বাচ্চাটির বন্ধু হতে পারো কিনা দেখো? তবে একটা জিনিস মাথায় রাখা জরুরি। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে মর্যাদা যেন হানি না হয়। কারণ, মমতার ব্যাকরণ শিখতে গেলে প্রথম ধাপ হচ্ছে, যাকে মমতা দেব তার মর্যাদায় যেন আঘাত না দিই।

আগামী মা দিবস আমরা যেন ব্যক্তিগতভাবে এমন একটি মাকে সম্মান জানিয়ে বলতে পারি, ‘তোমার সাহস আর কষ্ট দেখে আমি অভিভূত। তোমাকে স্যালুট। তোমার কষ্ট কমাতে এই প্রচেষ্টায় আমি তোমার পাশে থাকব।’

তবেই সামনের মা দিবসগুলো ঝলমল করে উঠবে মমতাময় বাংলাদেশে।

লেখক: চিকিৎসক ও শিক্ষক,কাউন্সিলর এবং সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বাংলাদেশ

আরও পড়ুন: