বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান একজন খলনায়ক মনোয়ার হোসেন ডিপজল। একটা সময় একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় তিনি খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। সেই সময় তাঁর অভিনীত চরিত্রের বলা অনেক সংলাপই জনপ্রিয় হয়েছিল। তেমনই একটি সংলাপ হলো:
‘কিনচি রে কিনচি, আমি টেনশন কিনচি। হস্তায় পাইছিলাম, বস্তায় বস্তায় কিনচি’...
এই সংলাপ কিন্তু আপনার, আমার জীবনের জন্যও প্রযোজ্য। মানবজীবনে টেনশন বা দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা থাকেই। কেউ যদি দাবি করেন যে, তার জীবনে এসব একেবারেই নেই—তবে একবাক্যে ধরেই নিতে হবে যে, তিনি ডাহা মিথ্যা কথা বলছেন!
একেক মানুষের জীবনে থাকে একেক রকমের টেনশন বা স্ট্রেস বা অ্যাংজাইটি। কর্মক্ষেত্র, পরিবার, অর্থনৈতিক অবস্থা, নিজের ব্যক্তিগত জীবন—সব জায়গা থেকেই কখনো না কখনো এসব ‘উপহার’ আসেই। কেউ সামলে নিতে পারে। কেউ কেউ আবার এসবেই ডুবে যায়। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা মনের পাশাপাশি শরীরেও প্রভাব ফেলে ব্যাপকভাবে। শুরু হয় শারীরিক অসুস্থতাও। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়। জীবন হয়ে যায় তিতকুটে, ভালো লাগে না কিছুই। আর তখনই মাথায় চলে আসে ডিপজলের বলা ডায়লগ—‘কিনচি রে কিনচি, আমি টেনশন কিনচি’!
তবে মানুষের দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা কমানোর উপায়ও আছে। এসব নিয়ে গবেষণা হয়েছে বিস্তর, আলোচনাও হয়েছে অনেক। গবেষকেরা বা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা তরিকাও দিয়েছেন এসব থেকে বাঁচার। অন্তত কমানোর উপায় তো অনেক আছে। এবার চলুন, তেমনই কিছু উপায় জেনে নেওয়া যাক।
শারীরিক কার্যক্রম বাড়াতে আমাদের অনেকেরই অনীহা থাকে। আমরা অনেক সময়ই কিছু রুটিন শারীরিক কার্যক্রম চালাই কেবল। কিন্তু স্ট্রেস বা টেনশন বেড়ে গেলে এর বাইরেও অনেক কিছু করতে হয়। শুধু রুটিন অনুযায়ী অফিস–বাসার মধ্যে হাত–পা নাড়ালে হয় না।
মার্কিন জার্নাল পাব সেন্ট্রালে ২০২০ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সপ্তাহে অন্তত ২ দিন অ্যারোবিক এক্সারসাইজ করলেও স্ট্রেস ও টেনশন কমে আসে। ১৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রায় ৬ সপ্তাহ ধরে এই গবেষণা চালানো হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে যে, নিয়মিত সপ্তাহে ২ দিন করে অ্যারোবিক এক্সারসাইজ করলে স্ট্রেস কমে। সেই সঙ্গে কমে নিজের তৈরি বিষণ্ণতাও।
২. প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগ
সাধারণত যখন আমরা উদ্বিগ্ন হই বা দুশ্চিন্তা করি, তখন অনেকেই নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয়। বাইরের মানুষ, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু–বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। প্রতিবেশী বা সহকর্মীর সঙ্গে হাই–হ্যালোও ঠিকমত করা হয় না হয়তো। কিন্তু এতে নিজেকে আরও আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলা ছাড়া, আর কিছু করা হয় না। ফলে দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ একজনের মনের ওপর আরও চাপ ফেলে, আরও ডালপালা মেলে।
তাই স্ট্রেস বা টেনশনে ভুগলে, পরিবার–পরিজন ও বন্ধু–বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলোতে আরও মনযোগী হতে হবে, সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এতে করে স্ট্রেস বা টেনশনের প্রতি আপনার কেন্দ্রীভূত মনযোগ কিছুটা কমবে। অন্যদিকে নজর দিলে দেখবেন, কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্ট্রেস কমে আসবে। তাছাড়া পরিবার–পরিজন বা বন্ধু–বান্ধবদের কাছ থেকে পাওয়া যায় মানসিক সমর্থনও। এমনকি নিজের সমস্যার সমাধানের উপায়ও বের হয়ে আসতে পারে।
এক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক হিতকর কাজেও নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন, স্বেচ্ছাসেবী হতে পারেন। সপ্তাহের কিছুটা সময় এই খাতে খরচ করলেও পেতে পারেন মানসিক প্রশান্তি। এতে স্ট্রেস কমবে বৈ বাড়বে না।
আপনি যদি মনে করতে থাকেন যে, এই স্ট্রেস বা টেনশন কমানোর কোনো উপায় বা কোনো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেই, তবে কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকবে। এতে করে আপনার নিজেকে আরও অসহায় মনে হতে পারে। তাই নিজের উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য প্রথমেই সমস্যার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিন। বিশ্বাস করতে শিখুন যে, এসব সমস্যা বা এসবের কারণে সৃষ্ট দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ কমানোর উপায় আপনার নিজের নিয়ন্ত্রণেই আছে। চাইলে আপনি নিজেই এসবের সমাধান করতে পারেন। কারণ এগুলো যেহেতু আপনাকে নিয়ে এবং ঘিরেই গড়ে উঠেছে, সুতরাং আপনি চাইলেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই পারেন। আর এভাবে যখন ভাবতে শিখবেন, তখনই দেখবেন সমাধান বের হয়ে আসছে। তাতে আপনার দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ যেমন কমবে, তেমনি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো হয়ে উঠবে।
৪. মনের ভার কমাতে হবে
স্ট্রেস বা টেনশনে ভুগতে থাকলে প্রত্যেকের শরীর ও মনে এক ধরনের ভার জমা হয়। তৈরি হয় স্ট্রেস রেসপন্স। ফলে এ সংক্রান্ত আরও নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা শারীরিক ও মানসিক—দুইই। তাই স্ট্রেস রেসপন্সকে মোকাবিলা করতে প্রয়োজন হয় রিল্যাক্সেশন রেসপন্স। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক হারবার্ট বেনসন মনে করেন, এই রিল্যাক্সেশন রেসপন্স হচ্ছে স্ট্রেস রেসপন্সের ঠিক বিপরীত। এটি হলে একজনের শ্বাস–প্রশ্বাসের গতি কমে আসে, হার্ট রেটও কমে এবং স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণের হার নিচে নামে। ফলে ধীরে ধীরে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তাও কমে।
আবার প্রচণ্ড স্ট্রেস বা টেনশনের মধ্যে থাকতে থাকতে হুট করে সবকিছু থেকে একটা বিরতি নেওয়া যায়। ড. শালু রামচান্দানি মনে করেন, এক কাপ চা পান করতে করতেও এই বিরতি নেওয়া যায়। কিংবা একবার স্নান করতে গিয়ে বা কিছুক্ষণের জন্য একটি জায়গায় একা একা হাঁটতে গিয়েও এমন বিরতি নেওয়া যায়। ওই সময়টায় স্ট্রেস বা টেনশন নিয়ে চিন্তা করা যাবে না। ধরে নিতে হবে যে, এসব থেকে একটু ছুটি পেতেই আপনি চা পান করছেন বা একা একা হাঁটছেন। এভাবে নিজের যতন্ন নিজেকেই নিতে হবে। এর ফলে হুট করেই দেখবেন, আপনার স্ট্রেস বা টেনশনে ডুবে যাওয়া মাথা একটু একটু করে ভেসে উঠছে।
৫. খেতে হবে ঠিকমতো
উদ্বেগ–উৎকন্ঠায় ভুগে অনেকেই খাওয়া–দাওয়া ভুলে যান। কেউ কেউ উল্টোপাল্টা খাবারও খান। সবচেয়ে অনিয়ম হয় এই ক্ষেত্রেই। কিন্তু এতে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কখনো কমে না। উল্টো শরীর খারাপ হয় এবং মানসিক অবস্থাও বাজে হয়ে যায়।
তাই খেতে হবে ঠিকমতো। সঠিক নিয়মে খেতে হবে সঠিক খাবার। এর জন্য পেশাদার পুষ্টিবিদের পরামর্শও নেওয়া যায়।
মনে রাখতে হবে, হাই ফ্যাট ও হাই সুগার সমৃদ্ধ খাবার জিভের জন্য ভালো হলেও এগুলো স্ট্রেস বাড়ানোয় ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালে হওয়া মার্কিন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনি বেশি করে খেলে স্ট্রেস বাড়ে। বিশেষ করে স্ট্রেসকে দীর্ঘায়িত করে এই ধরনের খাবার। এক্ষেত্রে ক্যাফেইন নেওয়ার মাত্রাও কমিয়ে নেওয়া যায়।
সুতরাং, খেতে হবে পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার। শাক–সবজি, মাছ, ফলমূল, বাদাম বা বীজজাতীয় খাবার এক্ষেত্রে উপকারী। এসবে স্ট্রেস ও টেনশন কমে আসে।
৬. কমাতে হবে স্ক্রিনটাইম
প্রযুক্তি ছাড়া দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করাই এখন কঠিন। একটা সময় ছিল বোকাবাক্স বা টেলিভিশনের। এখন দিন বদলে আরও ছোট স্ক্রিনে আমাদের চোখ এবং পুরো জীবনটাই আটকে গেছে। স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস ছাড়া আমাদের এখন চলেই না। তবে এতে ক্ষতিও হচ্ছে ঢের।
তাই স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি আসক্তি কমিয়ে আনতেই হবে। নইলে মনের ওপর থাকা চাপ কমবে তো নাই–ই, উল্টো বাড়বে।
৭. ইতিবাচকতার চর্চা জরুরি
স্ট্রেস বা টেনশন কেন হয়? অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্যই তো? এখন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হবে না, এমন নিশ্চয়তা কে দেবে? এই নিশ্চয়তা কোনো মানুষের পক্ষেই দেওয়া ও পাওয়া সম্ভব না। সুতরাং মানবজীবনে নেতিবাচক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবেই। সেসব থেকে উদ্বেগ আসবে, দুশ্চিন্তাও। তবে তাই বলে নেতিবাচকতায় ডুবে যেতে থাকেন, তাহলে তো হবে না।
ভালো কিছু ঘটলে যেমন আমরা কখনো কখনো ভাবি, ‘আরও ভালো কেন হলো না!’ ঠিক তেমনি খারাপ সময় এলেও ভাবতে হবে যে, ‘আরও খারাপও তো হতে পারত!’ অর্ধেক পানি থাকা একটা গ্লাসের শূন্যস্থানেও আপনি মনযোগ দিতে পারেন, আবার পূর্ণ স্থানেও দিতে পারেন। এভাবেই কেউ চাইলে ইতিবাচক থাকতে পারে, আবার নেতিবাচকও হতে পারে। ইতিবাচক হয়ে লাভ না পেলেও ক্ষতি কিন্তু নেই। তবে নেতিবাচক হলে শুধু ক্ষতিই জমা হবে ভাঁড়ারে।
সুতরাং স্ট্রেস বা টেনশন কমাতে ইতিবাচকতার চর্চা করা জরুরি। এতে করে ভালো ও সুস্থ থাকার সম্ভাবনা অন্তত বাড়বে।
তথ্যসূত্র: হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং, পাবমেড সেন্ট্রাল, হেলথলাইন ডট কম, হিন্দুস্তান টাইমস, মায়োক্লিনিক ডট ওআরজি, এনএইচএস ডট ইউকে, ভেরি ওয়েল মাইন্ড ডট কম, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক ডট ওআরজি ও এনপিআর ডট ওআরজি