ধরুন ঘড়িতে বাজছে রাত দুইটা। আপনার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, শরীর বলছে ‘ভাই প্লিজ এবার ঘুমা!’ কিন্তু আপনার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা যেন আপনার কথা শুনছেই না! আর একটা মাত্র রিল... আর একটা মাত্র খবরের শিরোনাম... আর একটা মাত্র ট্রল ভিডিও... ব্যস! কিন্তু এই করতে করতে কখন যে সকাল হয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না। ভাবছেন, এটা স্রেফ একটা সাধারণ খারাপ অভ্যাস? ভুল, এটি আসলে বর্তমান যুগের এক সাইলেন্ট কিলার। যার নাম ডুমস্ক্রলিং। আজ আমরা জানব, কীভাবে নিজের অজান্তেই এই ডুমস্ক্রলিং রাতের ঘুম চুরি করছে, ব্রেনকে ড্যামেজ করছে এবং কীভাবে এই মরণফাঁদ থেকে নিজেকে বাঁচাবেন।
ডুমস্ক্রলিং আসলে কী?
সহজ কথায়, ডুমস্ক্রলিং হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক নেতিবাচক, উদ্বেগজনক বা উত্তেজনাপূর্ণ খবর ও ভিডিও লাগাতার স্ক্রল করতে থাকা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলছেন, মানুষ এখন তথ্য খোঁজে না, বরং তথ্যের নোংরা স্রোতে ভেসে যায়। মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভয় কাজ করে—‘আরে! কোনো ট্রেন্ড মিস হয়ে গেল না তো?’ এই ভয় থেকেই আমরা বারবার পেজ রিফ্রেশ করি, কোনো নতুন নোটিফিকেশন না এলেও স্ক্রিন আনলক করি। এটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো (FOMO)। আপনি ভাবছেন খবর দেখছেন, কিন্তু আসলে খবর আপনাকে গিলে খাচ্ছে!
যেভাবে খুন হয়ে যাচ্ছে ঘুম
এখন প্রশ্ন হলো, এই ডুমস্ক্রলিং কীভাবে রাতের পর রাত আপনার ঘুমকে খুন করছে? এর পেছনে রয়েছে তিনটি বৈজ্ঞানিক কারণ।
প্রথম কারণ (নীল আলোর ধোকা): আমাদের চোখের সামনে যখন মোবাইলের স্ক্রিন থাকে, তখন তা থেকে একধরনের ক্ষতিকর নীল আলো বের হয়। এই আলো আমাদের ব্রেনের ‘পিনিয়াল গ্ল্যান্ড’-কে বোকা বানায়। ব্রেন মনে করে বাইরে এখনো দিনের আলো আছে! ফলে ঘুম আসার হরমোন ‘মেলাটোনিন’ আর নিঃসৃত হতে পারে না। ব্যস, ঘুম উধাও!
দ্বিতীয় কারণ (ব্রেনের ডোপামিন হ্যাকিং): আজকালকার শর্ট ভিডিও বা রিলগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা, যা প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে আপনার ব্রেনকে নতুন উত্তেজনা দেয়। প্রতিবার নতুন একটা ভিডিও স্ক্রল করার সঙ্গে সঙ্গে ব্রেনে রিলিজ হয় ডোপামিন হরমোন। ব্রেন তখন তৃষ্ণার্ত ড্রাগ আসক্তের মতো ছটফট করতে থাকে—‘আরেকটা ভিডিও দে, আরেকটা দে!’ ফল? রাত পার হয়ে গেলেও আপনি ফোন ছাড়তে পারেন না।
তৃতীয় কারণ (ব্রেনের যুদ্ধাবস্থা): মাঝরাতে যখন আপনি কোনো রাজনৈতিক সংঘাত, মারামারি, খুন বা সড়ক দুর্ঘটনার খবর দেখেন, তখন আপনার শরীর বিছানায় শুয়ে থাকলেও ব্রেন চলে যায় ‘যুদ্ধ মোডে’। ব্রেন মনে করে আপনার জীবন বিপন্ন! এমন উত্তেজিত ও সতর্ক ব্রেন নিয়ে কোনো মানুষের পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব।
ডুমস্ক্রলিংয়ের ভয়ংকর খেসারত
ঘুম না হওয়া তো কেবল শুরু। ডুমস্ক্রলিং আপনার পুরো জীবনটাকে তছনছ করে দিচ্ছে। আপনি কি মেলাতে পারছেন আপনার জীবনের সঙ্গে এই লক্ষণগুলো?
মানসিক ক্ষতি: সারাদিন বুক ধড়ফড় করা, অকারণ উদ্বেগ, হতাশা এবং ভয়াব রকমের স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া।
শারীরিক ক্ষতি: দিনভর মাথা ভারী হয়ে থাকা, চোখের নিচে কালি পড়া, ক্লান্তি এবং অল্প বয়সেই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি।
সামাজিক ক্ষতি: ঘরে ফিরেই আবার ফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকা। ফলস্বরূপ—বাবা-মা, ভাই-বোন বা জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের মতে, আজকাল ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় যে মনোযোগ কমে যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ কিন্তু এই ডুমস্ক্রলিং বা স্ক্রিন আসক্তি!
মুক্তির উপায়
তাহলে উপায় কী? আমরা কি মোবাইল ব্যবহার করা একদম ছেড়ে দেব? একদমই না! সমাধান হলো মোবাইলকে নিয়ন্ত্রণ করা, মোবাইলের দাস হওয়া বন্ধ করা।
১. ডিজিটাল কারফিউ জারি করুন: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ পুরোপুরি বন্ধ বা দূরে সরিয়ে রাখুন।
২. ফোনকে বিছানা থেকে তালাক দিন: ফোন চার্জে দিন আপনার বিছানা থেকে অন্তত পাঁচ হাত দূরে, যাতে ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে ফোন ছোঁয়া না যায়।
৩. নোটিফিকেশন সাইলেন্ট: ঘুমানোর সময় ফোনের ইন্টারনেট কানেকশন বন্ধ করে দিন অথবা ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোড চালু রাখুন।
৪. সোশ্যাল মিডিয়া ফিল্টার করুন: আপনার ফেসবুক বা ইউটিউব ফিড থেকে সমস্ত নেতিবাচক পেজ বা টক্সিক গ্রুপগুলোকে আজই আনফলো বা মিউট করুন। শুধু ইতিবাচক ও শিক্ষণীয় কনটেন্ট রাখুন।
৫. বিকল্প অভ্যাস তৈরি করুন: ঘুমানোর আগে স্ক্রল না করে বই পড়ুন, ডায়েরি লিখুন, মেডিটেশন করুন বা হালকা কোনো ইনস্ট্রুমেন্টাল গান শুনুন। ব্রেনকে শান্ত হতে দিন।
মনে রাখবেন, প্রযুক্তিকে আমরা ব্যবহার করব, প্রযুক্তির দ্বারা আমরা ব্যবহৃত হব না। একটা সুস্থ-সুন্দর জীবনের জন্য আজ রাতেই নিজের বিছানা থেকে মোবাইলের একটি স্বাস্থ্যকর দূরত্ব তৈরি করুন।