চলতি বছরে জুলাইয়ে দেশে ঘটে যাওয়া গণআন্দোলনে অনুপ্রাণিত ডিজাইনে তৈরি পোশাক এবার উঠে এলো ‘সাংহাই ফ্যাশন উইক’-এ। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন উইকে ভিন্নধর্মী পোশাকের এই উপস্থাপনা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ ফ্যাশন ডিজাইনার তাসমিত আফিয়াত আর্নি। সাংহাই মাতিয়ে এবার তিনি যাবেন মায়ামি। সেখানেও উপস্থাপন করবেন তাঁর অনন্য সংগ্রহ।
সাংহাইয়ে প্রদর্শিত সংগ্রহের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল জুলাই গণআন্দোলন। সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাসমিত আফিয়াত আর্নি বলেন, ‘এখানে আমি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। এছাড়াও দারুণ কিছু প্রস্তাবও। তবে তার জন্য আসলে সরকারি এবং বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন। আর কোনো রকম বিনিয়োগ ছাড়া এগুলো বাস্তবায়ন করাও কঠিন।’
আর্নি কাজ করছেন দেশীয় মোটিফের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডকে সমন্বয় করতে। সে লক্ষ্যে তিনি অংশ নিয়েছিলেন সাংহাইয়ের এই ফ্যাশন উইকে। এই মঞ্চেই তাঁর সঙ্গে আরও ছিল বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ডের উপস্থাপনা। যার মধ্যে অন্যতম ছিল আরমানি ও লুই ভিতোঁর। আর্নি মনে করেন, এটা কেবল নিজের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও গর্বের।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় ‘সাংহাই ফ্যাশন উইক ২০২৪’। ফ্যাশন উইকের এবারের থিম ছিল ‘সাসটেইনেবল হাইফ্যাশন’। এই বিষয়টিকে মাথায় রেখে জামদানি, নকশিকাঁথা, গামছা, খাদি, রাজশাহী সিল্কে পোশাক তৈরি করেন আর্নি। যেখানে অন্যতম মোটিফ ছিল ‘রিকশা পেইন্ট’। এই ফ্যাশন উইকে শতভাগ টেকসই কাপড় দিয়েই সব ডিজাইনার ও ব্র্যান্ড কাজ করেছে। আর্নিও তাই। তাঁর পোশাকের একটি ডিজাইনয়ে ফুটিয়ে তোলেন ‘মায়ের দোয়া’ লাইনটি। এটা আমরা মূলত রিকশা আর্টেই দেখতে পাই। রাজশাহী সিল্ক ও সুতির মিশ্রণে তৈরি কাপড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কল্কা ও ফুলেল প্রিন্ট।
খাদি কাপড়ে ডিজিটাল প্রিন্টের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন জুলাই আন্দোলন। জামদানি দিয়ে তৈরি পোশাকের সঙ্গে পরেছেন ‘মেটালের পিস’, যেখানে সোনালি রঙে লেখা ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব কাপড় হিসেবে সমাদৃত খাদি। তাঁর সংগ্রহ থেকে বাদ যায়নি এটাও। পোশাকের স্কার্টের প্রিন্ট করা হয়েছে ‘পানি লাগবে’, যা স্বরণ করিয়ে দেবে আন্দোলনে নিহত মুগ্ধের বলা কথা।
একাত্তরের শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের শ্রদ্ধা জানাতেও কাজ করেছেন তিনি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার প্রেরণায় পোশাকে করেছেন নকশা। বিদ্রোহী কবির ছবি আর কবিতার লাইন প্রিন্ট করে বসানো হয়েছে পোশাকে। এই পোশাক ফ্যাশন উইকে বেশ প্রশংসাও কুড়িয়েছেন বলে জানিয়েছেন অর্নি।
তিনি জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে আমি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কাজ করছি। এছাড়া এটা ছিল আমার তৃতীয় আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণ। আমার সৃজনশীলতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন একজিবিশন সাংহাইয়ের প্রধান নির্বাহী প্যাকো ডি জেমিস। তিনি দেখেছেন আমার সাসটেইনেবল লাকজারিয়াস ফ্যাশন সংগ্রহ। ফলে তিনি আমার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে আমাকে মেইল করে এই আসরে অংশগ্রহণের জন্য। তাঁরা আমার সাসটেইনেবল কালেকশন উপস্থাপন করতে চান বলেও জানান। কারণ তাঁরা এই আসরের মাধ্যমে টেকসই বিলাসী ফ্যাশনকে তুলে ধরতে চান।
এবারের সাংহাই ফ্যাশন উইকে অংশ নিয়ে ছিল ৯০ দেশের ফ্যাশন ডিজাইনাররা। সেখান থেকে মাত্র ১০ জন সুযোগ পান ফ্যাশন শোতে অংশগ্রহণের। যাদের মধ্যে আর্নি একজন। সেরা এই ১০ জন ডিজাইনারের সংগ্রহ প্রদর্শনীর জন্য সাংহাইতে একটা স্টোরও দেওয়া হয়েছে। যেখানে এসে বায়াররা পণ্য দেখে ও অর্ডার করতে পারবেন।
মজার বিষয় হলো, ফ্যাশন শোয়ের পর কয়েকটি দেশে তাঁর সংগ্রহ উপস্থাপনার আমন্ত্রণ পেয়েছেন আর্নি। যার মধ্যে রয়েছে পেরু, জিম্বাবুইয়ে, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ। এ মাসেই তাঁর পরের শো মায়ামিতে। তারপর কাতার ফাউন্ডেশন ও ইউএস এয়ারফোর্সের পৃষ্ঠপোষনায় দুটি ফ্যাশন শোতে অংশ নেবেন আর্নি।