ফ্যাশন ট্রেন্ড সাধারণত দেশের সংস্কৃতি ও বাজার দ্বারা প্রভাবিত হয়। ২০২৪ সালে এসে ফ্যাশনে বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু ট্রেন্ড দেখা গেছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন। বিশ্বজুড়ে ফ্যাশন ডিজাইনাররা এখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উপকরণের দিকে ঝুঁকছেন। বিদায়ী বছর রিসাইকেলড ফেব্রিক ও প্রাকৃতিক রঙের ব্যাবহার বেড়েছে।
বিদায়ী বছরের ফ্যাশন ট্রেন্ডে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মিনিমালিজম ও সিম্পলিসিটি। এ ছাড়া ফ্যাশন ট্রেন্ড হিসেবে উঠে এসেছে অ্যাকটিভ ওয়্যার। অ্যাথলেটিক সফিস্টিকেশন বলা হলেও মার্জিত রুচিশীলতার মিলিত বহিঃপ্রকাশ যেন হয়েছে এসব পোশাকে। এ ক্ষেত্রে কর্মঠদের পোশাকের আরামদায়ক বিষয়টির সাথে স্টাইলকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পলো শার্ট, ওয়াইড লেগ ফর্মাল প্যান্টের পাশাপাশি উজ্জ্বল ও চকচকে ফেব্রিক সমানভাবে ট্রেন্ড কাঁপিয়েছে। অন্যান্য ট্রেন্ডি ফ্যাশনের মধ্যে ছিল ফ্যাশনের গতিশীলতা, বোল্ড প্যাটার্ন ও পরিশীলিত শৈলীর মিশ্রণের প্রতিফলন।
ফ্যাশন ট্রেন্ডে সাসটেইনেবিলিটির প্রসঙ্গটি যে বেশ জোরালোভাবে কাজ করেছে, তা বলছেন কে-ক্র্যাফটের স্বত্বাধিকারী খালিদ মাহমুদ খানও। ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে তিনি বলেন, ‘এ বছরের পোশাকের নকশা বা প্যাটার্নে নানা ধরনের ধারা দেখা গেছে। সুনির্দিষ্ট একক কোনো ধারার শক্তিশালী প্রভাব দেখা যায়নি বললেই চলে। তার মাঝেও বিশেষ কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েছে। যেমন ট্র্যাডিশনাল মোটিফ সমসাময়িক আধুনিক প্যাটার্নে নতুন বিন্যাসে উপস্থাপনে নানা কাজ হয়েছে। এবং তা প্রশংসিতও হয়েছে। পাঞ্চাবি ও কামিজের প্যাটার্নেও বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। শাড়ির বুনন, সারফেস অরনামেন্টেশন ও লেআউটে, মোটিফের ব্যবহার ও কালারের বিন্যাসে বৈচিত্র্য ছিল। পোশাকে ডিজাইনার বা হাউসের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। সেই সাথে বেড়েছে সাসটেইনেবল ফ্যাশন বিষয়ে সচেতনতা ও চর্চা। নিজের পোশাক নানাভাবে ব্যবহার করা, আপসাইকেল ও রিসাইকেল করার বোধ এ বছর অনেক দেখা গেছে। সেই সাথে বেড়েছে ন্যাচারাল ডাইয়ের কদর। আরামদায়ক কাপড়ের ব্যবহার বাড়লেও, কমেছে পোশাকে সূচীকর্ম। আমদানি করা বিদেশি পোশাক বা বিদেশি ম্যাটেরিয়াল ব্যবহারের খুব একটা কমতি দেখা যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে সোর্স কান্ট্রির পরিবর্তন হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন, বিপণন ও বাণিজ্যের খরচ বেড়েছে। পূঁজির যোগান কমলেও বেড়েছে সুদের হার ও বিনিয়োগের খরচ। ফলে দেশে উৎপাদিত পণ্যের উদ্যোক্তারা আছেন চাপের মুখে।’
বাংলাদেশের ফ্যাশন ট্রেন্ডে ছিল সাসটেইনেবিলিটি ও ফিউশন ওয়্যার। পোশাকে কারুশিল্পের প্রাধান্যও বেশ লক্ষ্য করা গেছে। বিশদভাবে বলতে গেলে, পরিবেশবান্ধব অনুশীলনের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। তাই তো বাংলাদেশি ডিজাইনার বা নির্মাতারা টেকসই ফ্যাশনের ওপর জোর দিয়েছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ফিউশন ওয়্যার, যেখানে সমসাময়িক ডিজাইনের সাথে ঐতিহ্যবাহী দেশীয় উপাদানের সমন্বয় হয়েছে।
রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার সৌমিক দাস বলেন, ‘এ বছর রঙ বাংলাদেশ ফ্যাশনের যে ধারা প্রতিফলিত হয়েছে, তা প্রধানত আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী শৈলীর মিশ্রণ। ট্রেন্ড ফলো করার পাশাপাশি ফ্যাশনের বহুমুখিতা, রঙিন পোশাক ও টাইমলেসকে প্রাধান্য দিয়েছে। সকল উৎসবে থিমভিত্তিক ফ্যাশন রঙ নিয়ে হাজিরে হয়েছে। দেশীয় ঐতিহ্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে রঙ বাংলাদেশ সবসময় অগ্রগণ্য। ব্র্যান্ডটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমন্বয় করে ডিজাইন এবং রঙের ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে, তারা স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে নতুনত্ব আনতে চেষ্টা করেছে, যেখানে হাতে তৈরি কাজ এবং প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। এই বছর, রঙ বাংলাদেশে উজ্জ্বল রঙের পাশাপাশি নরম প্যালেটও ব্যবহৃত হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ব্র্যান্ডটির লক্ষ্য ছিল আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে ঐতিহ্যকে সংযুক্ত করা, যা তাদের পোশাকগুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও অর্থবহ করে তোলে।’
বাংলাদেশে, স্থানীয় ফ্যাশন ডিজাইনাররা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি কাপড় যেমন জামদানি ও নকশি কাঁথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন ডিজাইন তৈরি করেছেন। দেশীয় বাজারে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার দেখা গেছে; বিশেষ করে লাল, হলুদ ও সবুজ রং প্রাধান্য পেয়েছে। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আধুনিক ও পশ্চিমা স্টাইলের প্রভাবও লক্ষণীয় ছিল।
ফলে, ঢাকাতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে এই ধরনের মিশ্রণ দেখা গেছে, যেখানে সমন্বয় ঘটানো হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডের। সার্বিকভাবে, ২০২৪ সালের ফ্যাশন ট্রেন্ডগুলো বৈচিত্র্যময় ও উদ্ভাবনী ছিল, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরেছে।