সালতামামি ২০২৫

পোশাক শুধু ফ্যাশন নয়, হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা

ফ্যাশন কি কেবল কাপড়, কাট আর রঙের গল্প? ২০২৫ সাল সেই প্রশ্নের উত্তর নতুন করে লিখে দিয়েছে। এ বছর ফ্যাশন ছিল কখনো হাস্যরসের বিষয়, কখনো তীব্র বিতর্কের কেন্দ্র আবার কখনো সামাজিক প্রতিবাদের শক্তিশালী ভাষা। এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায়নি। রাজনীতির মঞ্চ থেকে সুপার বোল, ফ্যাশন উইক থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার ফিড, সবখানেই যেন ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাল ফ্যাশনের ঢেউ।

২০২৫ সালে ট্রেন্ড ছিল ঠিকই। কিন্তু ট্রেন্ডের বাইরেও ছিল বেশকিছু ঘটনা। যা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে কিছুটা হলেও নাড়া দিয়েছে। লাবুবু নামের একটি খেলনা যখন ফ্যাশন অ্যাকসেসরিতে পরিণত হয়। কিংবা একটি টুপি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আলো ছাপিয়ে যায়। তখন বোঝা যায়, ফ্যাশন এখন আর নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে নেই।

অভিষেক অনুষ্ঠানের সেই টুপি

২০ জানুয়ারি ২০২৫। যুক্তরাষ্ট্রের ৬০তম প্রেসিডেন্টের অভিষেক অনুষ্ঠান। সব নজর থাকার কথা ছিল শপথগ্রহণের দিকে। কিন্তু বাস্তবে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে মেলানিয়া ট্রাম্পের পরা নেভি ব্লু রঙের বিশাল টুপি। মায়ামিভিত্তিক ডিজাইনার এরিক জ্যাভিটসের তৈরি এই টুপির চওড়া কিনারা এমনভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়ে যে, পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে সেটিই হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন স্ত্রীর গালে চুমু দিতে যান, টুপির কিনারা সেই মুহূর্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় মিম উৎসব। কেউ বললেন, টুপিই অনুষ্ঠানের আসল নায়ক, কেউ আবার একে ক্ষমতা আর দূরত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন। রাজনীতি আর ফ্যাশনের মেলবন্ধন এমন ভাইরাল মুহূর্ত খুব কমই তৈরি করে।

সুপার বোলে কেন্ড্রিক লামারের জিনস

সুপার বোল হাফটাইম শো মানেই বিশ্বজুড়ে নজর। ২০২৫ সালে সেই মঞ্চে একক র‍্যাপার হিসেবে ইতিহাস গড়েন কেন্ড্রিক লামার। কিন্তু তার পারফরম্যান্সের সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় আসে পরা ফ্লেয়ারড ডেনিম জিনসটি। হেডি স্লিমেন ডিজাইন করা ‘মার্কো’ জিনস মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।

মঞ্চে ‘নট লাইক আস’ গানে ড্রেককে ইঙ্গিত করে ছোড়া তির্যক মন্তব্য, সঙ্গে টেনিস কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামসের উপস্থিতি ও নাচ। সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি পারফরম্যান্স নয়। বরং একটি সাংস্কৃতিক মুহূর্তে পরিণত হয়। ফ্যাশন এখানে বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে।

সিডনি সুইনির ‘গ্রেট জিনস’ বিতর্ক

২০২৫ সালে ফ্যাশনের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি আসে একটি বিজ্ঞাপন থেকে। আমেরিকান ঈগলের প্রচারণায় অভিনেত্রী সিডনি সুইনিকে নিয়ে ব্যবহার করা হয় স্লোগান, ‘সিডনি সুইনির গ্রেট জিনস’। শব্দের দ্ব্যর্থক ব্যবহারে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

অনেকে অভিযোগ করেন, এই বার্তা ইউজেনিক্স ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিত দেয়। একটি ভিডিওতে সুইনির বক্তব্য বিতর্ক আরও উসকে দেয়। ফলাফল, বয়কটের ডাক! তীব্র সমালোচনায় ব্র্যান্ডটি ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়। ফ্যাশন যে কত সহজে সামাজিক সংবেদনশীলতার সীমা ছুঁয়ে ফেলতে পারে, এই ঘটনা তার বড় উদাহরণ।

র‍্যাম্প থেকে আন্দোলনে

লন্ডন ফ্যাশন উইকের শেষ দিনে ডিজাইনার কনর আইভস র‍্যাম্পে হাজির হন ‘প্রটেক্ট দ্য ডলস’ লেখা টি-শার্ট পরে। ট্রান্স নারীদের প্রতি সংহতির এই বার্তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। আশির দশকের বলরুম সংস্কৃতি থেকে আসা ‘ডলস’ শব্দটি নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ পায়।

এই স্লোগান শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিবেদনে জানা যায়, এর মাধ্যমে ট্রান্স-নেতৃত্বাধীন হটলাইন ‘ট্রান্স লাইফলাইন’-এর জন্য প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড তহবিল সংগ্রহ হয়। অভিনেতা পেদ্রো পাসকালসহ একাধিক তারকা প্রকাশ্যে এই বার্তার প্রতি সমর্থন জানান। ফ্যাশন এখানে সরাসরি সামাজিক অবস্থান নেয়।

লাবুবু, খেলনা থেকে ট্রেন্ড

২০২৫ সালের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ফ্যাশন ট্রেন্ড ছিল লাবুবু। একটি কার্টুন চরিত্র কীভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ফ্যাশনে ঢুকে পড়তে পারে, তার উদাহরণ এটি। ব্যাগে ঝোলানো লাবুবু, বেল্টে লাগানো লাবুবু। সবখানেই তার উপস্থিতি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলিব্রিটিদের লাবুবু অ্যাকসেসরিজ ব্যবহার একে ভাইরাল সংস্কৃতির অংশ বানিয়ে দেয়। কেউ একে শিশুসুলভ বললেও, অনেকে দেখেছেন এটি নস্টালজিয়া আর খেলাচ্ছলতার প্রতীক হিসেবে। যদিও বছরের শেষের দিকে এই জনপ্রিয়তা একেবারেই ম্লান হয়ে যায়।

ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বদলের বছর

২০২৫ সালকে ফ্যাশন জগতে ‘মিউজিক্যাল চেয়ারের বছর’ বললেও ভুল হয় না। শ্যানেল, গুচ্চি, ডিওরসহ একাধিক বড় ফ্যাশন হাউসে একের পর এক ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বদল হয়। কে কোথায় যাচ্ছেন, কে বিদায় নিচ্ছেন? এই প্রশ্নই একসময় ফ্যাশন আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনগুলো শুধু ফ্যাশন নয়, ব্র্যান্ডের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অনেকেই বলছেন, ২০২৫ আসলে বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস।

পুরুষদের ফ্যাশনে সীমা ভাঙা

কেন্ড্রিক লামারের জিনসের বাইরে পুরুষদের স্কার্ট, ফ্লেয়ারড প্যান্ট আর ক্রপ টপও ২০২৫ সালে আলোচনায় আসে। র‍্যাম্প থেকে রেড কার্পেট, সবখানেই দেখা গেছে লিঙ্গভিত্তিক ফ্যাশনের সীমা ভাঙার প্রবণতা। কেউ একে সাহসী বলে প্রশংসা করেছেন, কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

২০২৫ সালে ফ্যাশনের ভাইরাল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মিম সংস্কৃতি। একটি টুপি, একটি জিনস বা একটি স্লোগান, সবকিছুই মিমে রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। ফ্যাশন এখন আর শুধু র‍্যাম্পে তৈরি হয় না, তৈরি হয় স্ক্রিনের ফিডে।

সব মিলিয়ে ২০২৫ প্রমাণ করেছে, ফ্যাশন এখন সমাজের দর্পণ। কখনো হাসায়, কখনো বিরক্ত করে, আবার কখনো ভাবতে বাধ্য করে। আর সেই কারণেই এই বছরের ভাইরাল ফ্যাশন মুহূর্তগুলো শুধু ট্রেন্ড নয়, সময়ের দলিল হয়ে থাকবে।