স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা তৈরিতে তরুণদের ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিতে হবে বলে জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর গুলশানের হোটেল আমারিতে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও কনকরডিয়া ইউনিভার্সিটির আয়োজনে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা হওয়ার পথ নিয়ে প্রাথমিক পরামর্শ সভায় কথা বলেন জুবাইদা রহমান।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, স্বাস্থ্য কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত বছরের পর বছর ধরে অবহেলা এবং জবাবদিহিতার অভাবের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে তাদের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭২ শতাংশ নিজেদের পকেট থেকে দিতে হয়, যার ফলে অসুস্থতা দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আমরা সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মর্যাদা ও সম্মানের সাথে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, যাতে চিকিৎসা বিল পরিশোধ করতে গিয়ে কেউ ধ্বংস হয়ে না যায় এবং মানসম্মত সেবা যেন সবার দোরগোড়ায় পৌঁছায়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময়ই একটি স্থিতিস্থাপক, সৃজনশীল এবং বাস্তবসম্মত সমস্যা সমাধানের জাতি। আমরা দারিদ্র্য, দুর্যোগ, রোগবালাই, বাস্তুচ্যুতি এবং নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছি। তবুও বারবার আমাদের মানুষ সাহসিকতা এবং স্থিতিস্থাপকতার সাথে তার মোকাবিলা করেছে।’
‘আমাদের স্বাস্থ্যের গল্পটি এই জাতীয় শক্তিরই প্রতিফলন ঘটায়। আমরা রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। গ্রামে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রাথমিকভাবে ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অপুষ্টি এবং অন্যান্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার দিকে মনোনিবেশ করবেন; রোগ প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করবেন এবং নারী, শিশু ও বয়স্কদের যত্নের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবেন।’
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী বলেন, ‘আজ আমরা স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের একটি নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি হচ্ছি। অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের জনসংখ্যা বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন নতুন নতুন ঝুঁকির সৃষ্টি করছে এবং নগরায়ণ মানুষের জীবনযাপন, কাজ এবং সেবা গ্রহণের পদ্ধতিকে বদলে দিচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো জটিল, এবং এগুলো কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা কোনো একটি একক খাত দ্বারা সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন চিন্তাভাবনার নতুন উপায়, নতুন অংশীদারিত্ব।’
জুবাইদা রহমান আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা হওয়া মানে কেবল কোম্পানি শুরু করা বা স্বাস্থ্যসেবাকে বাণিজ্যিকীকরণ করা নয়। এটি হলো বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীলতা, প্রমাণ এবং শৃঙ্খলা ব্যবহার করা। ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা, সম্প্রদায়ের কথা শোনা, বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করা, ধারণাগুলো পরীক্ষা করা, ব্যর্থতা থেকে শেখা এবং এমন মডেল তৈরি করা যা সমাজের জন্য নৈতিক, টেকসই এবং দরকারি। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি বিশেষ সুযোগ রয়েছে। আমাদের তরুণদের একটি বিশাল প্রজন্ম রয়েছে, যাদের শক্তি, ডিজিটাল সাবলীলতা, কল্পনাশক্তি এবং সামাজিক উদ্দেশ্যের বোধ আমাদের অন্যতম সেরা জাতীয় সম্পদ।’
স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা তৈরিতে তরুণদের ক্ষমতায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এই তরুণদের সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং সুযোগ দিতে পারি, যাতে তারা তাদের ধারণাগুলোকে বাস্তবে রূপান্তর করতে পারে। আমাদের তাদের সংযুক্ত করতে হবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, গবেষক, সামাজিক ও বেসরকারি খাতের উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে, যাতে তাদের সৃজনশীলতাকে সেই স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে পরিচালিত করা যায়, যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা এমন জায়গা তৈরি করতে পারে যেখানে শিক্ষার্থীরা কাজ করার মাধ্যমে শেখে, যেখানে শিক্ষকরা বিভিন্ন ডিসিপ্লিন বা অনুষদ জুড়ে একসাথে কাজ করেন এবং যেখানে বাস্তব পদক্ষেপের সাথে প্রমাণের সংযোগ ঘটে।’
‘তাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য একটি কোর্স বা প্রোগ্রাম ডিজাইন করার চেয়েও বড়। এটি হলো এই প্রশ্নটি করা যে, বাংলাদেশ কীভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে পারে। এমন একটি সংস্কৃতি যা আমাদের বর্তমান এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে, সাহসী ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নিতে এক নতুন প্রজন্মের স্বাস্থ্য নেতৃবৃন্দকে প্রস্তুত করবে; বাংলাদেশে এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে যেখানে প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যই গুরুত্বপূর্ণ।’
‘আমি আনন্দিত যে এখানে অনেক অংশীদার একত্রিত হয়েছেন। কারণ কোনো একক প্রতিষ্ঠান একাকী এই পথ তৈরি করতে পারে না। একসাথে, আমরা স্বাস্থ্য উদ্যোক্তাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অংশীদারিত্ব, মেন্টরশিপ, নেটওয়ার্ক এবং শেখার সুযোগগুলো তৈরি করতে পারি।’
জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আমরা উচ্চাভিলাষী হতে পারি, তবে একই সাথে বাস্তবসম্মতও হতে পারি। আমি আশা করি, এই আলোচনাটি সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশে স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত পথ তৈরি করবে। সর্বোপরি, আমি আশা করি এটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে উদ্ভাবন কেবল নতুন ধারণার বিষয় নয়। এটি সেবার বিষয়, এটি দায়িত্বের বিষয়, এবং এটি বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও মর্যাদার বিষয়।’