জিয়াউর রহমান হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত, আত্মগোপনে ছিল ‘জন ডো’ ছদ্মনামে

‘জন ডো’ ছদ্মনামে একাধিক পাসপোর্টে ভারতসহ অন্তত ৩ দেশে ৪৬ বছর আত্মগোপনে ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর মোজাফফর হোসেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তারা জানান, জিয়াউর রহমানের  কক্ষ শনাক্তের দায়িত্বে ছিল মোজাফফর। শুধু হত্যাই নয়, গোপনে মরদেহ দাফনের পরিকল্পনাও ছিল তার। তদন্তে উঠে আসছে তার দীর্ঘ পলাতক জীবন, ভুয়া পরিচয় ও জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নতুন তথ্য। 

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার অন্যতম কুশিলব মেজর মোজাফফর। এরপর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় গোপনে দাফনের মূল পরিকল্পনাও তার; বলছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তারা।

সামরিক আদালতে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারে ১৮ সেনা কর্মকর্তার সাজা হয়। এদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। সে সময়ে মেজর খালেদ ও মোজাফফর পালিয়ে যান। 

গোয়েন্দা সুত্রগুলো বলছে জন ডো ছদ্ধনামে একাধিক পাসপোর্ট ছিল মেজর মোজাফফরের। এমনকি, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও ই পাসপোর্টও ছিল তার। এতো বছর কলকাতা, সিঙ্গাপুরে ভিন্ন নামে লুকিয়ে ছিল সে।   

সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা বলছেন, সরাসরি হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল মেজর মোজাফফর। এর আগেও জিয়াউর রহমানকে হত্যার জন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৩ বার চেষ্টা করেছিল তারা। 

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর বলেন, মোজাফফর গিয়ে শনাক্ত করে মেজর জিয়া কোন রুমে আছে। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) জগলুল আহসান বলেন, ১৯৮০ সালে ডিসেম্বর মাসে যখন বিএমএ’র পাসিং আউট প্যারেট হয়, তখন ডিনারে অফিসাররা পিস্তল নিয়ে গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতেও কক্সবাজারে একটা এক্সারসাইজ ছিল যেখানে দ্বিতীয়বার হত্যাচেষ্টা করা হয়েছিল। 
 
বিশ্বরাজনীতি, এরশাদকে সেনাপ্রধান করা, চট্টগ্রামের জিওসি জেনালের মঞ্জুরকে স্টাফ কলেজে বদলি ও সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্বকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। 

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর বলেন, তিনি জেনারেল মঞ্জুকে খুব উচ্চস্বরে বললেন, ওয়েট ফর ইউর টাইম। অ্যন্ড শো ডু রেসপেক্ট টু জেনারেল এরশাদ। এই হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ আগের ঘটনা। এরপরে জেনারেল মঞ্জুকে জিওসি থেকে সরিয়ে স্টাফ কলেজ কমান্ডার বানানো হলো।  

 নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) জগলুল আহসান বলেন, জেনারেল মোজাফফর হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি জেনারেল মঞ্জুকে ফোন করে বলেছিলেন যে, দ্যা প্রেসিডেন্ট ই কিলড। আবার পরদিন সকালে জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়ে যে রাঙ্গুনিয়ায় দাফন করা হয়েছিল, সেখানেও কিন্তু জেনারেল মোজাফফর ছিলেন।  

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনালের মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনালাপের ফরেনসিক পরীক্ষায় মোজাফফরের তথ্য পায় প্রসিকিউশন। এ মামলায় পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের তদন্তের মুখোমুখি করার দাবি প্রসিকিউশনের।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা টেলিফোনে বলেন, পাসপোর্ট কারা ইস্যু করেছে, কোন কর্মকর্তা এতে জড়িত রয়েছে– সে বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। সেসকল বিষয়েও আশা করি তদন্তকারী কর্মকর্তারা তদন্ত করবেন। 

সামরিক আদালতে মেজর মোজাফফরের বিচার কার্যক্রম চলছে।