লন্ডনে গাড়ি চালানোর পরীক্ষা দেওয়ার ১০ বছরেরও বেশি সময় পর সম্প্রতি বাংলাদেশে ড্রাইভিং টেস্টে উত্তীর্ণ হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকেই এবার বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থা, বিআরটিএ'র সেবা প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট শেয়ার করেছেন তিনি। পোস্টে তিনি নিজের অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
ফেসবুক পোস্টে জাইমা রহমান জানান, তিনি দুটি ড্রাইভিং টেস্টেই প্রথমবারে পাস করেছেন। তবে দুই দেশের পরীক্ষার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। তিনি লিখেছেন, গাড়ি চালানোর বাস্তবতার জন্য একটি পরীক্ষা তাঁকে যতটা প্রস্তুত করেছে, অন্যটি ততটা করেনি। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে গিয়ে তিনি কেবল পরীক্ষার কথা ভাবেননি, বরং ভেবেছেন সড়ক ব্যবহারের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা এবং তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থার কথা।
ঢাকার তরুণদের মৌলিক হতাশার কথা উল্লেখ করে জাইমা বলেন, এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে তরুণদের কাছে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হয়, যা সব সময় নিরাপদ বা অনুমানযোগ্য নয়। পোস্টে সড়ক ব্যবহারের বিশৃঙ্খলতার একটি চিত্রও তুলে ধরেন তিনি।
পথচারীদের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'পথচারী হিসেবে আপনাকে হয়তো পর্যাপ্ত ক্রসিং ছাড়াই দ্রুতগতির সড়ক পার হতে হয়, এমন ফুটপাত ধরে হাঁটতে হয় যেটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায় কিংবা দখল হয়ে থাকে, আর পথ করে নিতে হয় বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও প্রাইভেট কারের ভিড়ের মধ্য দিয়ে, যেগুলোর প্রত্যেকটি চলছে আলাদা আলাদা অলিখিত নিয়মে।'
জাইমা রহমানের পোস্টে যাত্রীদের ভোগান্তির কথাও উঠে এসেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, 'যাত্রী হিসেবে আপনার হাতে কার্যত কিছুই থাকে না। আপনার বাসটি যাত্রী তোলার জন্য অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দেবে কি না, হঠাৎ ব্রেক কষবে কি না, গাড়িটির যান্ত্রিক ফিটনেস আছে কি না, কিংবা চালক ঠিকমতো প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না, কোনো কিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই।'
'নতুন চালক হিসেবে সবকিছু নিয়ম মেনে করতে গেলে আরেক দফা প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়,' বলেও জানান তিনি।
বিআরটিএ'র সেবাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলেও মত তাঁর। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেন, অনলাইনে সেবা শুরু হওয়ার পর সমাধান যদি শেষ পর্যন্ত ‘অফিসে এসে কথা বলুন’-এ গিয়ে ঠেকে, তবে ডিজিটাল করার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
তাঁর মতে, 'প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় সশরীর যোগাযোগ দেরি, পক্ষপাত কিংবা লেনদেনের নতুন সুযোগ তৈরি করে। ব্রোকারেরা এই প্রক্রিয়ার ফাঁটলটিরই সুযোগ নেয়। মানুষ আইন ভাঙতে চায় বলে নয়, বরং সরকারি প্রক্রিয়াটি এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে একজন মধ্যস্থতাকারীই সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে দাঁড়ায়। এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ এতে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না থেকে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।'
বাংলাদেশ চমৎকার সব আইন তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে জাইমা রহমান আরও বলেন, 'কিন্তু নিয়ম যদি বেছে বেছে প্রয়োগ হতে দেখা যায়, মানুষ দ্রুতই সেসব নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। একজন নতুন চালক তখন ভাবেন: আমাকে বলা হচ্ছে নিয়ম মানা অপরিহার্য, অথচ চোখের সামনেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া চালনা আর নানা লঙ্ঘন দিব্যি চলছে। কেন?'
সড়ক পরিবহন খাতের দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা তাই কেবল অন্যায়টি ঘটা নয়, সেটির প্রতিকার কীভাবে হয়, সেটিও। অভিযোগ করে কিছু হবে না, বরং নিজেরই বাড়তি ভোগান্তি হবে, মানুষ যদি এমনটা বিশ্বাস করে, তাহলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটি দাঁড়ায়: ‘কী দরকার? চেনাজানা কাউকে বলি।’
জাইমা রহমানের মতে, সড়ক নিরাপত্তা কেবল গাড়ি, লাইসেন্স বা শাস্তির বিষয় হতে পারে না। এটি হতে হবে মানুষকে ঘিরে—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নারী, ফুড ডেলিভারি রাইডার, বাসচালক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা রিকশাচালক—যাঁদের প্রত্যেকের কাছে একই সড়কের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। সঠিক নীতিমালার অভাব দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আরও বেশি শোষণ ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আট বছর পরও শিক্ষার্থীদের সেই উদ্বেগগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে। ফলে 'প্রশ্নটি এখন সম্ভবত আর এই নয় যে ‘সড়ক নিরাপদ নয়’। প্রশ্নটি বরং এই: ‘সমস্যাগুলো তো আমরা আগেই চিহ্নিত করে দিয়েছি। ব্যবস্থাটি এখনো সেগুলো ঠিক করল না কেন?'
ফেসবুক পোস্টের শেষে চিন্তার কাঠামো বদলের আহ্বান জানান জাইমা রহমান। শুধু নাগরিকদের ওপর নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে তিনি বরং পুরো ব্যবস্থার ভাবনার কাঠামো নতুন করে সাজানোর তাগিদ দেন। এক্ষেত্রে মূলত চারটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসেন তিনি।
প্রশ্নগুলো হচ্ছে, পরিচিতি বা সংযোগ থাকুক বা না থাকুক, সবার জন্য সমান সেবা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে; আইন প্রয়োগকে কীভাবে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব; অভিযোগ দেওয়াকে কীভাবে নিরাপদ ও কার্যকর করা যাবে; এবং রাস্তার ডিজাইন এমন কীভাবে করা যায়, যাতে একটি সাধারণ ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে।
পোস্টের শেষে তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশে একটি কার্যকর, নিরাপদ ও মানবিক সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংস্কারের পাশাপাশি নীতি নির্ধারকদের ভাবনার মূলে পথচারী ও চালকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।