ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিবিদদের বিচারবহির্ভূত আটক বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গত রোববার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার পর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে শত শত ব্যক্তি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়া কারাগারে বন্দী রয়েছেন।
সংগঠনটি জানিয়েছে, হাসিনা সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে কিছু কর্মকর্তা হয়তো জড়িত ছিলেন, কিন্তু অনেককে প্রমাণের তোয়াক্কা না করেই আন্দোলনকারীদের হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিবার ও আইনজীবীদের অভিযোগ, বন্দীদের মধ্যে অনেকে বয়োবৃদ্ধ এবং মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। তবে তাঁদের জামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিযোগ গঠন ছাড়া আটক থাকা অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে মারা গেছেন।
অবশ্য প্রতিবেদনটির বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, কেউ যাতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হয়, সেদিকে সরকার সতর্ক আছে। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বা অন্য দলের কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার যাতে না হয়, সেদিকে সতর্ক রয়েছে বর্তমান সরকার।’
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, ‘প্রমাণ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। বর্তমান সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘমেয়াদি ও নির্বিচারে আটক রাখা বন্ধ করা উচিত।’
মানবাধিকার সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, বিনা বিচারে আটকে রাখা ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ সমর্থক সাংবাদিকও আছেন। অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুম, খুন ও নির্যাতনের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
আদালতে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন না করেও সরকারি আইনজীবীরা জামিনের বিরোধিতা করছেন জানিয়ে এতে বলা হয়, নিম্ন ও জেলা আদালতগুলো নিয়মিতভাবে জামিন নামঞ্জুর করছেন এবং হাইকোর্ট জামিন দিলেও নতুন মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে তা আটকে দেওয়া হচ্ছে।
বিবৃতিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের মামলার বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এক আন্দোলনকারীকে হত্যার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী তিন মাসে তাঁর বিরুদ্ধে আরও ৪টি মামলা দেওয়া হয়। নিম্ন আদালত প্রতিবারই জামিন নামঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট জামিন দিলেও পুলিশ নতুন মামলা দিয়ে তাঁর মুক্তি আটকে দেয়। অবশেষে আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপের পর গত ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। এই পুরো সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন করা হয়নি।
এইচআরডব্লিউ আরও বলছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও ১৬০ জনের বেশি আটক ব্যক্তির কাউকেই জামিন দেয়নি। সাবেক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার ২২ মাস ধরে বিনা বিচারে কারাগারে আটক আছেন। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনসহ একাধিক বয়োবৃদ্ধ নেতা কারাগারে মারা গেছেন।
ইলেইন পিয়ারসন বলেন, ‘যে বিচারব্যবস্থায় অভিযোগ গঠনের আগেই বয়োবৃদ্ধরা কারাগারে মারা যান, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং বিনা বিচারে দীর্ঘমেয়াদি আটক রাখা বন্ধ করা।’