জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সফর ও কর্মসূচি তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
সংবাদ সম্মেলনে সচিব বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল সোমবার নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। এ সফরে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। নিউইয়র্কের কর্মসূচি শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন।’
এ সময় পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কয়েকটি দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। আবার, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাই, এটি আমাদের জন্য একদিকে যেমন বিরল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অন্যদিকে তেমনি বিশেষ মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়। তৃতীয়ত, অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হবেন। এসব বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
আসাদ আলম সিয়াম বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এই অধিবেশনের তাৎপর্য অনেক। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ আন্তর্জাতিক শান্তি ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও আজ বিশ্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ২০৩০ অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের সময়ও দ্রুত কমে আসছে। এসকল বাস্তবতায় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা; সংলাপ, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান; আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘এই বৈশ্বিক বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী এবারের অধিবেশনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। নিউইয়র্কে পৌঁছে তিনি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করবেন। সকালে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য দেওয়া স্বাগত প্রাতঃরাশে যোগ দেবেন। এরপর তিনি এবারের অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করবেন। সন্ধ্যায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।’
‘২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন। এরপর তিনি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে এবং স্পেন কর্তৃক আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য রাখবেন। বিকেলে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। এসব সভায় তিনি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান তুলে ধরবেন।’
‘২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।’
পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আয়োজনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন। ২৩ সেপ্টেম্বরে তিনি রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক সাইড ইভেন্টে রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন। ২৪ সেপ্টেম্বরে তিনি মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। এসময় তিনি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরবেন এবং স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করবেন।’
তিনি বলেন, ‘সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এর মধ্যে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে বৈঠকগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’
‘এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।’
‘তাছাড়া, অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে তিনি ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ আরো কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ; উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা; দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, ‘এই সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের নতুন যাত্রাকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এর মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, শান্তিপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের বার্তা দিতে চাই।’