ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রে জিম্মি রাষ্ট্রসংস্কার: টিআইবি

রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রসংস্কারের যে অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রসংস্কারের দায়িত্ব বাস্তবায়নে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ও সাহসী উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের কাছে আপস করার কারণে রাষ্ট্রসংস্কারের কাঙ্ক্ষিত ভিত্তি তৈরি হয়নি। এর ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাবে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দৃশ্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে।

টিআইবি বলছে, সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রসংস্কার এখন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী জোটও জনস্বার্থে রাষ্ট্রসংস্কারে সহায়ক ভূমিকা পালনের পরিবর্তে দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলো ও আমলাতন্ত্র শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আজ এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রসংস্কারের এজেন্ডা এবং জুলাই জাতীয় সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। এমন অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন এবং আইন প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রসংস্কারের বিষয়টি কার্যত ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বর্তমান সরকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছে। এর মধ্যে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও জোরদার করে জবাবদিহি দুর্বল করার সুযোগ তৈরি করে—এমন অধ্যাদেশগুলো পাস করা হয়েছে। অন্যদিকে, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক অধ্যাদেশগুলো রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক শক্তির যোগসাজশে জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য—জবাবদিহিমূলক ও দায়বদ্ধ সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রধান রাজনৈতিক দলের দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণে ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাবের লাগামহীন বিস্তার রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গ তুলে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রসংস্কারের বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দল একমত হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে বিল পাস না করে ২০০৪ সালের আগের আইনে ফিরে যাওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আস্থার সংকটে থাকা দুদকের সেই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ রহিত করে সম্প্রতি যে আইন পাস করা হয়েছে, তা প্রকৃত স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ঘটনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দিয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। র‍্যাব বিলুপ্ত করার পরিবর্তে নতুন নামে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাবান করা হয়েছে, যদিও সংস্থাটি দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সিংহভাগ ঘটনার জন্য দায়ী বলে পরিচিত।

অন্যদিকে, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে সবাই একমত হলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সম্পদের বিবরণী প্রকাশ এবং তা নিয়মিত হালনাগাদের বিধান নিয়েও ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর এ ধরনের নির্দেশনা বা চর্চার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সার্বিকভাবে, জুলাই আন্দোলনের পেছনে থাকা জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সরকার নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতাহীন ক্ষমতাকাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসহ ক্ষমতাকাঠামোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিণতি রাজনৈতিক দলগুলো এত অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে ভুলে গেল, সেই প্রশ্নও তোলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলসহ অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রণীত হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে সরকারি দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল তখন ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চার মোহে সরকারি দল সেই অভিজ্ঞতার বিপরীত পথে হাঁটছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটও মূলত দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।

গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নজিরবিহীন মতৈক্যের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রসংস্কারের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনেও সব রাজনৈতিক দলের প্রতি একই ধরনের সদিচ্ছা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।