আমি-তুমি থেকে গণ-উদ্বেগ, কোথায় চলেছে বিশ্ব

জি-২০ সম্মেলন শেষ হয়েছে। দিল্লি ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এ সম্মেলন থেকে বিশ্বনেতারা টেকসই উন্নয়ন ও পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। এই সম্মেলন থেকে যৌথ ঘোষণা আসাটাকেই একটা বড় প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আবার এই ঘোষণা আসার পেছনে সম্মেলনে রাশিয়া ও চীনের প্রেসিডেন্টের অংশ না নেওয়াটাকে কার্যকারণ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। এই ঘোষণা ও এর পেছনে ক্রিয়াশীল কারণটির দিকে তাকালেই এক ধরনের বৈশ্বিক মেরুকরণের আঁচ পাওয়া যায়। কথা হলো বৈশ্বিক মঞ্চ যখন মেরুকরণের ইঙ্গিতবাহী, তখন ছোট একক হিসেবে দেশগুলো কি বাদ পড়ে?

ওপরের প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো- না। দেশে দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ না থাকলে, একটা সহমর্মী ও সহনশীল রাজনীতির পরিবেশ থাকলে বৈশ্বিক পরিসর কখনোই বিভাজনের রেখায় বিভক্ত হতে পারে না। জি-২০ সম্মেলন যে দেশে অনুষ্ঠিত হলো, সেই দেশের দিকে তাকানো যাক। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ও দলটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতির অভিযোগ করেন অনেকেই।

থাকুক সেই অভিযোগ। যৌথ ঘোষণার নেপথ্য কারণ হিসেবে যে ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিংয়ের অনুপস্থিতির কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের পশ্চিমারা কীভাবে উপস্থাপন করে? সোজা উত্তর-একনায়ক। এই একনায়কেরই নরম সংস্করণ ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসক এখন কি দেশে দেশে নেই? আছে। কিন্তু তাদের নিয়ে পশ্চিমাদের চলতে তেমন সমস্যা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা পশ্চিমাদের ‘অনুরোধক্রমে আদেশ’গুলো মাথা পেতে নিচ্ছেন।

দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনের ছবি। ছবি: টুইটারপশ্চিমা বিশ্ব বহু বছর ধরেই এই ‘আমি-তুমি’-এর খেলা খেলছে। তাদের ভাষ্যমতে, ‘হয় তুমি আমার পক্ষে, নয়তো বিপক্ষে’। অর্থাৎ, মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। হয় সাদা, নয় তো কালো। কোনো ধূসর অঞ্চল নেই। এই যে নির্দিষ্ট বর্গে ফেলে দেওয়ার রাজনীতি, এটাই কিন্তু এখন দেশে দেশে অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের মূল রসদ। পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র ও মূল্যবোধের চর্চা ছাড়া, আর কোনো কিছুই ঠিক সভ্য-ভব্য হবে না- এই অতিসরলীকরণের ফাঁদে পড়েই এখনকার বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদের কিনারে উপস্থিত হয়েছে।

একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের পতন হয়। এক হয় দুই জার্মানি। সমাজতান্ত্রিক কাঠামো থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। আশা ছিল অগ্রগমনের হাত ধরে স্বাধীনতা ও সহনশীলতার এক উন্নত পরিবেশে বিশ্ব প্রবেশ করবে, যা বিনিময়ে আরও আরও অগ্রগতি নিয়ে আসবে। কিন্তু অগ্রগতির বদলে এসেছে উন্নয়ন। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের হাত ধরে খুলে গেছে ভোগের দরজা। সমষ্টির ভাবনারহিত সেই বিশ্ব ক্রমেই আত্মপুজারি হয়ে উঠেছে। আর এই আত্মকেন্দ্রিকতাই ধীরে, অতি ধীরে মানুষের সামাজিক সম্পর্কগুলোয় এনেছে বদল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জমানায় প্রবেশের পর এই বদলের পালে লেগেছে জোর হাওয়া।

হ্যাঁ, অগ্রগতি এসেছে। ১৯৮৯ থেকে ২০১৯-এই তিন দশকে বৈশ্বিক উৎপাদন বেড়েছে চারগুণ। বিশ্বের ২০০ কোটি অতিদরিদ্র মানুষের ৭০ শতাংশ দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে কোনো না কোনোভাবে বেরোতে পেরেছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই একই সময়ে ‘অগ্রগতি’ আকার পেয়েছে ‘উন্নয়ন’ ধারণায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধ্বজা উড়েছে। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে ভোগে গেছে পারস্পরিক সহনশীলতা, যা পশ্চিমা সভ্যতার ‘আদার’ বা অন্যান্য ধারণারও সম্প্রসারণ।

দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনের ছবি। ছবি: টুইটারএখন এই ইউরোপ ও মার্কিন ব্যবস্থাপত্রের ‘আদার’ ধারণাটিকেই সামনে আনছে বাকিরা। ‘গণতন্ত্র’, ‘বাকস্বাধীনতা’, ‘মূল্যবোধ’ ইত্যাদি যাবতীয় ধারণাকেই এখন ‘পশ্চিমা ধাঁচ’ তকমা দিয়ে বাকি বিশ্বের নেতারা খারিজ করছেন, বিশেষত যাদের বিরুদ্ধে ‘কট্টর’ বা ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনের অভিযোগ রয়েছে।

মজার বিষয় হচ্ছে রাশিয়া বা চীনের মতো দেশ ও তাদের অধুনা অনুসারী দেশগুলো পশ্চিমাদের দোহাই দিয়েই পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকে এড়ানোর গল্প ফাঁদছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা পশ্চিম প্রযোজিত এবং অতি অবশ্যই পশ্চিমে জনপ্রিয়তা পাওয়া বি-উপনিবেশায়ন তত্ত্বকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

দ্য ওয়ার্ল্ড ভ্যালুস সার্ভে জানাচ্ছে, গোটা বিশ্বেই মেরুকরণ বাড়ছে। কমছে সহনশীলতা। বিশেষত ধর্মীয় সহনশীলতা কমছে। বিশ্বের ৯০টি দেশের ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের তথ্য তুলে ধরে এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণদের মধ্যে বিশেষত সহনশীলতা কমছে। একইসঙ্গে বাড়ছে প্রথাবদ্ধ ধর্মীয় মূল্যবোধ। বিশেষত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিসর কমছে। একই অবস্থা উত্তর ইউরোপ ও আমেরিকায়ও। সেখানেও দেখা যাচ্ছে, বয়স্কদের তুলনায় তরুণেরা বেশি কট্টর।

চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো অবশ্য এক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক না করে বি-উপনিবেশায়নের তত্ত্বকেই সামনে আনছে। গণতান্ত্রিক চর্চা ও এর পরিসরকে ছোট করে আনার অজুহাত হিসেবে তারা সরাসরি বলছে, এগুলো পশ্চিমা নয়া-সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো জিইয়ে রাখার এক-একটি উপাদান মাত্র। তারা সরাসরি বলছে, মানুষ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা চায়। অথচ তাদের ওপর পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী প্রণীত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার একটি সংস্করণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনের ছবি। ছবি: টুইটারএই তর্কটি অনেক দিন ধরেই চলছে। এই যুক্তিটিও নতুন নয়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে সরাসরি এই ভাষ্য অনেক দিন ধরেই দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়াও পিছিয়ে নেই। আর তাদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে এই বঙ্গ থেকে শুরু করে সুদূর আফ্রিকা-বহু দেশেই এই বাক্য ও ‘অখণ্ড’ যুক্তি উচ্চারিত হয়েছে ও হচ্ছে। সাদা চোখে ঠিকই আছে। কিন্তু মুশকিল হলো- যখন এই যুক্তিকে আর যুক্তির জায়গায় না রেখে দেশে দেশে শাসকগোষ্ঠী একে নাগরিক অধিকার সংকোচনের অজুহাত হিসেবে কাজে লাগায়।

নাগরিক অধিকার সংকোচনের ফল বড় ভয়াবহ। কোনো নাগরিকেরই মৌলিক অধিকারবোধ পশ্চিম বা পূর্ব ইত্যাদি ধারণা থেকে জন্মায় না। খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ইত্যাদি চাহিদা যেমন একেবারে মৌলিক, তেমনি এর বিপরীতে জোগান না থাকলে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা ক্রোধও অবধারিত। ফলে বি-উপনিবেশায়ন বা অন্য যে তত্ত্ব দিয়েই এই নাগরিক অধিকার হরণ করা হোক না কেন, তা আর ধোপে টেকে না। নাগরিকেরা তখন এর প্রতিবাদ করে। নিজেদের চাওয়াটা জানায়। তাতে কাজ না হলে সেই কথিত ‘নিরাপত্তা’ প্রশ্নেই তারা নানা ঘোষিত বা অঘোষিত জোট বাঁধে। সমাজের ভেতরে সৃষ্টি হতে থাকে ছোট ছোট বর্গ, যার প্রতিটিই আবার ‘আমি-তুমি’-এর দৃষ্টিতে গোটা সমাজকে দেখতে থাকে।

এ যাত্রায় নাগরিকেরা পূর্বে খারিজ হওয়া কাঠামোগুলোর দিকেই যাত্রা করে বা বলা ভালো যাত্রা করতে স্বস্তি বোধ করে। এ ক্ষেত্রে তারা নানা ধর্ম-বর্ণ বা জাতিভিত্তিক বর্গকে বেছে নেয় নিজেদের নিরাপত্তা বলয় হিসেবে। একটু চোখ মেললেই বোঝা যাবে-ভারতে বা পাকিস্তানে বা আফগানিস্তানে যা হচ্ছে ধর্মের নামে, পশ্চিমা সমাজে তাই হচ্ছে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠতাবাদিতার নামে।

মজার বিষয় হলো-দেশে দেশে এই বিবর্তন বা আবর্তনটি চলে নিরাপত্তার নামেই। শাসকগোষ্ঠী নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিক অধিকার হরণের যে ক্রিয়া করে, তার ঠিক বিপরীত ক্রিয়া সমাজের গভীর থেকে উঠে আসতে থাকে নিরাপত্তার নামেই। উভয় পক্ষই নিজেদের কর্মকাণ্ড জায়েজ করতে আঁকড়ে ধরে ‘নিরাপত্তা’ নামের এক অদেখা বস্তুকে। এক অবিচ্ছেদ্য মিত্রের মতোই তারা একে-অপরকে বাড়িয়ে তোলে, দেয় শক্তি। দুজনের হাতেই থাকে এক অব্যর্থ অস্ত্র ‘উদ্বেগ’।

এই উদ্বেগের ব্যাপারীরা সবকিছুই করে ‘বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’-কে সামনে রেখে। এটি আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জি-২০ সম্মেলন হোক বা জাতিসংঘ অধিবেশন হোক, সবখানেই কথায় কথায় এই ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ শব্দ দুটি উচ্চারিত হতে দেখা যায়।  যেন কখনো কেউ ভুলতে না পারে। এই পুনঃ পুনঃ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তারা এও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এ দুটিই আসলে তাদের পণ্য, যা জনতা পেয়ে গেলে তাদের ব্যবসা হারাতে হয়। ঠিক একইভাবে ব্যবসাটি জারি রাখতে হলে ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’-কে বাস্তবতা নয়, সংকট হিসেবে থাকাটাই সমীচীন।

এই দুই শব্দ যে যত বেশি উচ্চারণ করে, বুঝতে হবে সে তত বেশি উদ্বেগ ছড়াতে চায়। আর যে যত উদ্বেগ ছড়াবে, সে তত বেশি ব্যবসায় আগ্রহী। কীসের ব্যবসা? কর্তৃত্বের। ফলে পাড়া-মহল্লা, দেশ বা অঞ্চল বা বিশ্ব মঞ্চ যা-ই হোক উদ্বেগের বাজার ভালো দেখলে সাবধান হওয়া ভালো। কারণ, এটি বলে দেয় রাজদণ্ডধারীদের লক্ষ্যটা আসলে কী?

ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন