গণতন্ত্রের আড়ালে নব্য-সাম্রাজ্যবাদ: বিশ্বব্যবস্থায় নৈতিকতার চরম বিপর্যয়

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই আধিপত্যবাদী ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ল্যাটিন আমেরিকায় নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও ত্যাগ করতে পারেনি। গণতন্ত্র প্রসারের আড়ালে মূলত ভেনেজুয়েলার বিশাল খনিজ ও তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যে এই নাটকের নেপথ্য কারণ, তা আজ বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট। 

 

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম

​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক অধ্যায়। মার্কিন প্রশাসন একে ‘নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর’ বললেও, এটি মূলত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি ‘হস্তক্ষেপমূলক নীতি’র এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই অন্য একটি দেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘোষণা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার মূল ভিত্তি ‘রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব’ এবং জাতিসংঘের সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। যে রাষ্ট্রটি বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের শিক্ষক হিসেবে নিজেদের জাহির করে, তাদের এই কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি কেবল তখনই তাদের কাছে কার্যকর, যখন তা ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষা করে। এটি মূলত তাদের দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী আচরণ এবং নিজেদের বৈশ্বিক আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার এক চরম ঔদ্ধত্য।

​মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই আধিপত্যবাদী ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ল্যাটিন আমেরিকায় নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও ত্যাগ করতে পারেনি। গণতন্ত্র প্রসারের আড়ালে মূলত ভেনেজুয়েলার বিশাল খনিজ ও তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যে এই নাটকের নেপথ্য কারণ, তা আজ বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, যেখানেই পশ্চিমা স্বার্থে আঘাত লেগেছে, সেখানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ‘সরকার পরিবর্তন’-এর মরণখেলা খেলেছে। ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের’ মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ, লিবিয়াকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং সিরিয়া ও আফগানিস্তানে দশকের পর দশক চলা ধ্বংসযজ্ঞ এর জাজ্বল্যমান প্রমাণ। তাদের এই কর্মকাণ্ড কেবল শাসকের পরিবর্তন আনেনি, বরং ঐসব অঞ্চলে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা, লাশের মিছিল এবং লাখ লাখ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই বিশ্বের কোনো উন্নয়নশীল দেশ তাদের এই হঠকারী নীতির কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করেছে, তখনই সেখানে তথাকথিত ‘মানবিক সাহায্য’ বা ‘গণতন্ত্র’ রক্ষার দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনা হয়েছে।

​আমেরিকার এই মানবাধিকারের বুলি কতটা অন্তঃসারশূন্য, তা তাদের নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ বর্ণবাদ এবং বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের চিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের ‘খণ্ডিত বিচারব্যবস্থা’ আজ বিশ্বশান্তির প্রধান অন্তরায়। একদিকে তারা স্বাধীনতার বাণী শোনায়, অন্যদিকে ফিলিস্তিনের গাজায় নিরপরাধ মানুষের ওপর চালানো নৃশংতায় সরাসরি রাজনৈতিক সমর্থন ও মারণাস্ত্র সরবরাহ করে। তাদের চাপিয়ে দেওয়া ‘অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা’ মূলত একটি নীরব যুদ্ধ, যা ইরান থেকে কিউবা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। শক্তির দাপটে বিশ্বের মানচিত্র আর শাসনতন্ত্র নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই প্রবৃত্তি আন্তর্জাতিক আইনকে আজ এক অর্থহীন দলিলে পরিণত করেছে, যা সমগ্র বিশ্বকে এক চরম অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

​এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের কালো মেঘ থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও কখনো মুক্ত থাকেনি। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ষড়যন্ত্রমূলক ও নেতিবাচক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তারা যখন পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যাকে সরাসরি সমর্থন করেছিল এবং ‘সপ্তম নৌবহর’ পাঠিয়ে স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয়কে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল, তখনই তাদের প্রকৃত রাজনৈতিক চরিত্র উন্মোচিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকেও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারেনি। যখনই এদেশের কোনো সরকার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজস্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছে, তখনই আমেরিকা ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা বাতিল, বিনিয়োগে বাধা কিংবা কথিত সুশাসনের দোহাই দিয়ে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের মুখে তাদের অযাচিত খবরদারি মূলত এদেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে শৃঙ্খলিত করার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ।

​ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি দেশের সংকট নয়, বরং এটি বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক চরম সতর্কবার্তা। যদি শক্তি থাকলেই অন্য রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার বৈধতা পায়, তবে সভ্যতার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বর্তমানের এককেন্দ্রিক বিশ্বের পরিবর্তে এমন একটি ‘বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, যেখানে প্রতিটি জাতির নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার থাকবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কেবল শক্তিধর রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে, তবে মানবাধিকার শব্দটা একটি বাণিজ্যিক স্লোগান ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বৈষম্যহীন প্রয়োগই পারে বিশ্বকে এই ভয়াবহ সাম্রাজ্যবাদী অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিতে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশ বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি এবং সাধারণ নাগরিক–সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, ধর্ষণ,...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
আরেকটি সাধারণ আশঙ্কা হলো–এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও কণ্ঠস্বর জনমত ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগগুলো যৌক্তিক। তবুও এসব উদ্বেগ আদতে আরও অস্বস্তিকর ও মৌলিক...
ইয়েমেনের তাইজে হুতি বিদ্রোহীদের ১৬ যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে সেনাবাহিনী। এছাড়া ৮ ঘণ্টার দীর্ঘ লড়াইয়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে বলেও জানায় তারা।
জুলাই সনদ সই হওয়ার এক বছর আজ। বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা। সরকার বারবার বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ সনদ বাস্তবায়ন করবে তারা। তবে একথা মানতে নারাজ বিরোধীরা। দুপক্ষের মধ্যে সংবিধান সংশোধন আর সংস্কার...
পূজার ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পথে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের সাথে ধাক্কায় মোটরসাইকেলে থাকা হিটলার বিশ্বাস (৩৫) নামের এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার ছয়দিনের মাথায় চাকরি খোয়ালেন হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সচিব কেটি জ্যাকারিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে প্রথম কয়েক দিনেই যোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও...
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর