বাবা-মায়ের একাধিক সন্তান থাকলে, জনশ্রুতি আছে যে কোনো কোনো সন্তান নাকি হয় বাবার, নয় মায়ের অনেক বেশি প্রিয়। বাস্তবেও এসব নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন। রবীন্দ্রনাথের অতিথি গল্পের কথা মনে আছে? গল্পের নায়ক তারাপদর কাছে মতিলালবাবুর স্ত্রী অন্নপূর্ণা প্রশ্ন করিলেন, ‘তোমার মা নাই?’
তারাপদ কহিল, ‘আছেন।’
অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তিনি তোমাকে ভালোবাসেন না?’
তারাপদ এই প্রশ্ন অত্যন্ত অদ্ভুত জ্ঞান করিয়া হাসিয়া উঠিয়া কহিল, ‘কেন ভালোবাসবেন না?’
অন্নপূর্ণা প্রশ্ন করিলেন, 'তবে তুমি তাঁকে ছেড়ে এলে যে।'
তারাপদ কহিল, ‘তাঁর আরো চারটি ছেলে এবং তিনটি মেয়ে আছে।’
অন্নপূর্ণা বালকের এই অদ্ভুত উত্তরে ব্যথিত হইয়া কহিলেন, ‘ওমা, সে কী কথা! পাঁচটি আঙুল আছে বলে কি একটি আঙুল ত্যাগ করা যায়।’
আসলে বাবা-মায়ের কাছে তো সব সন্তানই প্রিয়। তবে আরেক রকম অবস্থা তৈরি হচ্ছে দেশের আপামর জনসাধারণের বেলায়। ছেলে বা মেয়ের মতো এ দেশে স্পষ্টত একটা বিভক্তি তৈরি হচ্ছে আয়-রোজগারের দিক থেকে। যিনি সরকারের কাছ থেকে বেতন পান তিনি যে সুবিধা ভোগ করেন, ঠিক সেই জায়গাতেই অসুবিধা ভোগ করছেন বেসরকারি খাতের কর্মীরা। পরিবার বা সমাজের হিসাব আলাদা। কিন্তু যখন এ ক্ষেত্রে দেশ, সরকার বা রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ এসে যায়, তখন তা মেনে নেওয়া কঠিন।
এসব আলোচনা এই মুহূর্তে উঠছে মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ডে সাড়ে ২৭ শতাংশ আয়কর আরোপের কারণে। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, কর্মীদের চাকরি পরবর্তী সময়ের আর্থিক সুরক্ষায় প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্য তহবিল গঠনের বিধান আছে শ্রম আইনেই। প্রতি মাসে বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে রাখা হয়। এই টাকার সাথে সমপরিমাণ অর্থ দেয় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে গঠন করা হয় প্রভিডেন্ট ফান্ড। এখানে জমানো টাকা সঞ্চয়পত্র কেনাসহ নানা ধরনের লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে কোম্পানি। এই মুনাফা পরবর্তীতে কর্মীদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়।
এতদিন এই মুনাফায় ১০ শতাংশ উৎসে কর আদায় করত এনবিআর। নতুন আইনে প্রভিডেন্ট ফান্ড স্বীকৃতি পেয়েছে কোম্পানি হিসেবে। ফলে, এ ফান্ড নিয়মিত অডিট করে এনবিআরে রিটার্ন দিতে হবে। পাশাপাশি সাড়ে ২৭ শতাংশ কর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে শুরু হয়েছে অসন্তোষ। বেসরকারি চাকরিজীবীদের দাবি, প্রভিডেন্ট ফান্ডে এ অতিরিক্ত কর পুরোপুরি বৈষম্যমূলক। এটি প্রত্যাহারের দাবিও দিনকে দিন জোরদার হচ্ছে।
এই যে দেশের একটি বিশাল অংশের নাগরিকেরা নিজেদের বৈষম্যের শিকার বলে মনে করছেন, তার কারণ আসলে কী? কারণটি হলো সরকারি কর্মকর্তাদের পাওয়া তুলনামূলক বিপুল সুবিধা। অবস্থা অনেকটা দাঁড়াচ্ছে সুয়োরাণি-দুয়োরাণির সেই রূপকথার গল্পের মতো। সমস্যা হলো, ঘটনাটি রূপকথার কল্পিত জগতে হচ্ছে না। হচ্ছে ইট-কাঠ-পাথরের এই দেশে, বাস্তবেই।
যে প্রভিডেন্ট ফান্ডের আয়ে করারোপ নিয়ে এত আলাপ, সেই তহবিলের ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মচারীদের সুবিধা কী, তা জেনে নেওয়া যাক। সরকারি খাতের কর্মীদের প্রফিডেন্ট ফান্ডে আছে করমুক্ত সুবিধা। মানে একেবারে সর্বোচ্চ সুবিধা। বুঝুন তবে। কোথায় আকাশের তারা, আর কোথায় জমিনের নাড়া!
প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে যে অর্থ চাকরিজীবীরা পেয়ে থাকেন, তার সুবিধা কতটা? এক কথায়, অনেক। নিজের পরিবারে এই সুবিধা আমার মতো অধমও ভোগ করেছে। অতি নিকটাত্মীয় একজনকে দেখেছি কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর এই প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ দিয়েই বাকিটা জীবন চলতে। এবং তা সম্ভব হয়েছিল কারণ সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি করমুক্ত সুবিধায় প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাগুলো তুলতে পেরেছিলেন। ফলে কিছু বাড়তি অর্থ অবশ্যই তিনি পেয়েছিলেন। এবং কর্মজীবন শেষে পড়ন্ত বয়সে সেই বাড়তি টাকাটুকু যে কতটা কাজে লাগে, তা ওই পরিস্থিতিতে থাকা মানুষেরাই বোঝেন। আর এই বাস্তবতা এ দেশের অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ক’জন আর চাকরি করে গাড়ি-বাড়ি বানাতে পারেন, বলুন?
সরকারি কর্মচারীরা এই সুবিধা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই পেয়ে আসছেন। বেসরকারি খাতের কর্মীরা সেটিও পাচ্ছেন না। ১০ শতাংশ কর কেটে নেওয়া নিয়ে খেদ থাকলেও বেসরকারি চাকরিজীবীরা তা অনেকাংশে মেনেও নিয়েছিলেন। যদিও সেটি বৈষম্যের সংজ্ঞার ভেতরেই পড়ে। হ্যাঁ, ছোট বৈষম্য, তবে বৈষম্য তো অবশ্যই। কিন্তু এখন তো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! ১০ থেকে কর কেটে নেওয়ার হার চলে গেছে ২৭ শতাংশে।
আসল কথা হলো, প্রভিডেন্ট ফান্ড মূলত এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা জাল। আমাদের মতো দেশে এটি দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো, যখন মানুষের বয়স থাকবে না উপার্জন করার মতো, তখন যেন তারা চলতে পারে। কিন্তু সেই প্রধান উদ্দেশ্যই যদি ব্যাহত হয়, তবে তো প্রভিডেন্ট ফান্ড তৈরির ব্যবস্থাটি চালু রাখার যৌক্তিকতা নিয়েই সংশয় জাগে।
এর পাল্টা যুক্তিও আছে বটে। দেশ চালাতে গেলে টাকা লাগে। সেই টাকা সরকারকে কর হিসেবে জনগণের কাছ থেকেই আদায় করতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর নিশ্চয়ই কর আদায়ের হার বাড়ানোর জন্যই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। মূল উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সমালোচনার জায়গা নেই। কথা হলো, তাহলে খাত নির্বিশেষে সব কর্মজীবীর ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না কেন? সরকারের কর খাত থেকে আয় বেশি হলে, সেটি তো দেশের কাজেই লাগবে। সেক্ষেত্রে সব পেশাজীবীকে সমান হারেই এ ক্ষেত্রে অবদান রাখা প্রয়োজন। কিন্তু তা না করে, এক পক্ষকে একেবারে দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা, বাকি সব দায় চাপিয়ে দেওয়া হলো অন্য পক্ষের ঘাড়ে। মজার ব্যাপার হলো, যে মানুষগুলো এই আইনের খসড়া তৈরি এবং চূড়ান্তভাবে তা প্রয়োগ-বাস্তবায়নের কাজ করবেন, তারা সবাই সরকারি কর্মচারী। এখন যদি বেসরকারি কর্মজীবীরা পুরো বিষয়টি সম্পর্কে বলেন—‘নিজেদেরটা ঠিক রেখে আমাদের পকেট কাটা হচ্ছে!’ তখন জবাব কী হবে?
এমনিতেই বর্তমানে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য নিয়ে জোর আলোচনা বিরাজমান। সম্প্রতি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এক সংলাপে উঠে এসেছে যে, গত এক যুগে দেশে ধনী-গরীবে বৈষম্য বেড়েছে ৮০ গুণ। অথচ গত ৬ বছরে দারিদ্রের হার কমে বর্তমানে হয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অতি দারিদ্রের হারও কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে। কিন্তু এসব অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে ধনী-গরিবের মধ্যে থাকা বৈষম্য। এমন পরিস্থিতিতে যেখানে এই বৈষম্য কমাতে আমাদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন, সেখানে উল্টো নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে দুই পা এগোনোর পর আবার পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে এক পা।
আশার কথা হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি এনবিআরের করনীতি শাখার কাছে এ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এখন এর সন্তোষজনক ও যৌক্তিক সমাধান হওয়াই দস্তুর। তা না হলে, বেসরকারি খাতের অনেক পেশাজীবীই চাকরি-পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিতে পড়বেন। মনে রাখতে হবে, সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেটে ছুরি চালালে কিন্তু আম ও ছালা– দুই-ই যাবে।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন