আমাদের দেশে বছরের পর বছর ধরে ফুটবল মানেই ছিল দুটো ভাগ—হয় আকাশি-সাদার ম্যারাডোনা-মেসি, না হয় হলুদ-সবুজের পেলে-নেইমার। ড্রয়িংরুমের আড্ডা থেকে শুরু করে চায়ের কাপের ঝড়, সবই আবর্তিত হতো এই দুই মেরুকে ঘিরে। বাবার প্রিয় দলটাই যেন অলিখিত নিয়মে হয়ে যেত সন্তানের ফুটবল-ধর্ম।
কিন্তু নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে দিতেই তো নতুন প্রজন্মের আগমন! আজওয়াদ, ফাইজান, রাউজনের আরশ কিংবা রাজশাহীর মুস্তাফিজ ভাইয়ের ছেলে রিয়াসাত কিংবা রবির মেয়ে জুহাইনা, কক্সবাজারের হুজাইফা —তারা কিন্তু কোনো পারিবারিক প্ররোচনায় পা বাড়ায়নি। তারা কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আবেগের সস্তা তরী বেছে নেয়নি। তারা চাক্ষুষ কোনো ট্রফি বা ম্যারাডোনার রূপকথা শোনেনি, বরং নিজের কানে শুনেছে এক আধুনিক রূপকথা। এক পর্তুগিজ যুবকের গল্প, যার নাম—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!
পাঁচ পার হয়নি কারো কেউ আবার ছয় সাত বছরের কোটায়। এই ছোট্ট শিশুরা যখন ভাঙা ভাঙা গলায় সিআরসেভেনের (CR7) গল্প বোনে, তখন বোঝা যায় ফুটবলের সৌন্দর্য আসলে কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় বা পতাকায় আটকে থাকে না। ঐতিহ্যবাহী আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের চেনা বৃত্ত থেকে বের হয়ে তারা ভালোবেসেছে একাই এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা এক সেনাপতিকে।
কেন এই শিশুরা কোনো পারিবারিক বলয় ছাড়াই রোনালদোর প্রেমে পড়ল? কারণ রোনালদোর গল্পটা রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৩০টিরও বেশি গোল) এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাজা তিনি।
আজওয়াদদের চোখে রোনালদোই সেরাদের সেরা। তারা যখন টিভির পর্দায় রোনালদোকে গোল করার পর সেই বিখ্যাত ‘সিউউউ’ (Siuuu) উদযাপনে মেতে উঠতে দেখে, তখন তাদের বুকেও এক অচেনা রোমাঞ্চ জাগে। এই ছোট্ট বয়সেই তারা ঐতিহ্যের দাসত্ব না করে বেছে নিয়েছে লড়াকু মানসিকতার এক ফুটবল আইকনকে।
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের চিরন্তন দ্বৈরথের বাইরে এসে বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন ফুটবল বসন্ত। কোনো পূর্বপুরুষের প্রভাব ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দে একটি দেশের নতুন প্রজন্ম পর্তুগালের লাল-সবুজ পতাকাকে আপন করে নিচ্ছে—এটাই তো ফুটবলের আসল জাদু, এটাই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
লেখক: গণম্যাধমকর্মী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



