হরতালে মানুষের অ্যালার্জি কতটা

সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান জামাল (ছদ্মনাম)। নাম বদলাতে হলো কারণ সাংবাদিক পরিচয় শুনে গরিব মানুষ হওয়ার দোহাই দিয়ে তিনি আর নাম প্রকাশ করতে চাননি। হরতালের মধ্যেও নিজের বাহন নিয়ে বের হয়েছেন জামাল। হরতালের প্রসঙ্গ তুলতেই এক বাক্যে বলে দিলেন, ‘গরিবের হিসাব কেউ করে না!’

এই বক্তব্য যে জামাল শুধু হরতাল ডাকনেওয়ালাদের উদ্দেশে দিয়েছেন, তা নয়। তাঁর দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক দল বা মতবাদের সমর্থক নন। তাঁর আছে শুধু পেটের দায়। আর সেই চিন্তা থেকেই তিনি যেমন গতকাল সংঘর্ষের খবর শুনেও গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তেমনি আজও নেমেছেন। কারণ রাস্তায় গাড়ি বন্ধ মানে তাঁর চাল কেনাও বন্ধ।

এই এক হিসাবই দেখিয়ে দেয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে হরতালের দা-কুমড়া সম্পর্কের চিত্র। অথচ একটা সময় আমরা নিজেরাই মাসব্যাপী হরতাল দেখেছি। স্কুল-কলেজের কত ক্লাস, পরীক্ষা পিছিয়ে যেত হরতালের ডাকে। গুজরাটি এই শব্দকে বাঙালি রাজনীতিবিদেরা বেশ আপন করে নিয়েছিলেন। দাবি আদায়ের মোক্ষম অস্ত্রই যেন হরতাল। আর সেই হরতালই এখন সাধারণ বা খেটে খাওয়া মানুষের দুই চোখের বিষ হয়ে গেছে যেন!

যেমনটা বলছিলেন গৃহকর্মীর কাজ করা তছলিমা আক্তার। তাঁর কথায়, ‘হরতাল হইলে আমার কী?’ আর এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না মেলাতেই হয়তো বগুড়ার মো. সোহেল সকাল সকালই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। তাঁর জবানিতে, ‘বের হতে হয়ই। পরিবার আছে, বাচ্চা আছে।’ এদের অস্তিত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার পেছনেও আসলে কাজ করে সেই পেটের টানই।

পেটের কারণে মানুষ বাঁচে? নাকি মানুষের কারণে পেট বাঁচে? এটি আসলে ডিম আগে, নাকি মুরগি আগের মতো বিষয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে এ দেশের মানুষের একটি বিশাল অংশ আসলে প্রথম প্রশ্নের উত্তরেই ইতিবাচক উত্তর দিতে শিখে গেছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় জরিপেও। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে চালানো ন্যাশনাল সার্ভে অব বাংলাদেশ নামক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করা হয়েছিল এ দেশের বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে। তার উত্তরে শুধু অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিল ৩৭ শতাংশ মানুষ। প্রথম পাঁচটি প্রধান সমস্যা ছিল যথাক্রমে দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে আঙুল তুলেছিল মাত্র ৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। বাদবাকি চারটি সমস্যাই কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং এসবের দিকে আঙুল তোলা মানুষের হার ৭৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, এ দেশের মানুষ এখন সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার উন্নতি বা অবনতি নিয়েই বেশি চিন্তিত। ওপরের ওই একই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, চলতি বছরে নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নতির আশা তারা কতটা করেন। এর উত্তরে একই রকম অর্থনৈতিক অবস্থা বা স্থিতাবস্থায় থাকা এবং ক্রমান্বয়ে উন্নতির আশায় থাকা মানুষের হার ছিল প্রায় ৬৩ শতাংশ। সূতরাং এটি বলাই যায় যে, রাজনীতিকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল হচ্ছে ধীরে ধীরে। ওপরের জরিপটি চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের। এর পরের এতগুলো মাসে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সেই ভাবনা যে আরও গাঢ় হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

হরতালে দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আগের চেয়ে ঢের বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে এমনিতেই পৃথিবীতে অর্থনৈতিক সংকট গভীর হচ্ছে। তার কথা বলে এ দেশেও দেশি মুরগির পাড়া ডিম থেকে উচ্ছে-পটল—সব কিছুরই দাম বাড়ে-কমে। হরতালে সেটি আরও অস্থির হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সুতরাং সাধারণ মানুষ হয়তো সেই শঙ্কাকেই বরং প্রধান প্রতিবন্ধকতা মনে করছে এখন।

অন্যদিকে হরতাল পালিত হলে দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও আগের চেয়ে ঢের বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৩ সালে দেশীয় অর্থনীতির আকার বিবেচনায় সেই অঙ্কটি এখন ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি। ক্ষতির ক্ষেত্রে উপর থেকে যত নিচের দিকে (শ্রেণি ও বিত্ত বিবেচনায়) যাওয়া যায়, তত অঙ্ক কমলেও জ্বালা বাড়ে বেশি। আর বর্তমানে দেশে উপর ও নিচের মধ্যকার ব্যবধান বা বৈষম্য যত বাড়ছে, এই জ্বালার তীব্রতাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

এসব কারণেই হয়তো রাস্তায় গাড়ি বন্ধ থাকলেই এ দেশের সাধারণ মানুষের কপালে ভাঁজ পড়ে বেশি। কারণ গাড়ির চাকা না চললে পেটও যে চলে না। ফলে যা পেটের জন্য উপযুক্ত নয়, তাতে হয়তো মনও সায় দেয় না খুব একটা।

অবশ্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এই বাস্তবতা সব রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রযোজ্য। আমাদের মেনে নিতেই হবে যে, পেটে লাথি মারার রাজনীতি সাধারণেরা আর গ্রহণ করছেন না। নীতি বলতে এখন তাঁরা বেশি গুরুত্ব দেন অর্থনীতিকেই। ওই চাকা না ঘুরলে রাজার নীতি নিয়ে আর কার কী আসে যায়!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন