রাস্তায় হাঁটলে কিংবা রাস্তার পাশের চা–দোকান কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের যেকোনো আড্ডায় কয়েকদিন ধরেই একটা গুঞ্জন—২৮ তারিখ কী হবে? উত্তরে নানা শঙ্কার কথা উঠে আসছে। সেই শঙ্কা সংঘাতের। কারণ, আজ ২৮ অক্টোবর রাজধানীর কাছকাছি দুটি স্থানে সমাবেশ ডেকেছে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল।
বিএনপি নয়াপল্টনে নিজ কার্যালয়ের সামনে ডেকেছে মহাসমাবেশ। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ডেকেছে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ। দুই দলই রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকেই সমাবেশ দুটি ডেকেছে। সেটাই তো স্বাভাবিক। ক্ষমতার রাজনীতিতে যেকোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আরোহণের লক্ষ্যকে পাখির চোখ করেই তার যাবতীয় কর্মসূচি পরিচালিত করে। আর গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রায় নিয়েই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল। এটাই তো নিয়ম।
ফলে এই জনগণ বা সাধারণ মানুষ, আরও ভালো করে বললে ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের লক্ষ্য–উদ্দেশ্য ইত্যাদি সবার সামনে উপস্থাপন করে। এ জন্য সভা–সমাবেশ করাটা অনেক পুরোনো রেওয়াজ। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অবশ্য অনেক নতুন উপায়ের খোঁজ মানুষ পেয়েছে। কিন্তু পুরোনো ও কার্যকরি উপায় হিসেবে সমাবেশের আবেদন এখনো অনেক। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের কর্মসূচি দেয়। এখানেও তার অন্যথা হওয়ার কথা নয়। হচ্ছেও না।
প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কেন এমন কর্মসূচির কথা শুনলেই দেশের মানুষ ঘাবড়ে যাচ্ছে? শুধু সাধারণ মানুষ কেন, আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেকটা দুশ্চিন্তায় আছে বলতে হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বৃহস্পতিবার এ নিয়ে উভয় দলকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেওয়া আহ্বান জানিয়েছে। এ আহ্বানই প্রকারান্তরে অশান্তির শঙ্কাকে উসকে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, তেমন আশঙ্কা আছে বলেই কি ডিএমপি সবাইকে সতর্ক করল?
এই সমাবেশ দুটির অনুমোদন নিয়েও অনেক নাটক হয়েছে। শুরুতে ডিএমপি রাস্তায় এ ধরনের সমাবেশ করতে দিতে অনিচ্ছুক ছিল। তারা খুবই যৌক্তিক অবস্থান থেকে উভয় দলকে অনুরোধ করেছে—তারা যেন অন্য কোনো স্থানে, খোলা মাঠে সমাবেশ করে। কিন্তু দুই দলের কেউই রাজি হয়নি। অবশেষে নিজেদের পছন্দের জায়গায় সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে।
এতটুকু পর্যন্ত ঠিক আছে। দুটি বড় রাজনৈতিক দল সমাবেশ করবে। রাজধানীর সড়কে। লাখ লাখ লোকের সমাগম হবে সেখানে। ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা খুবই স্বাভাবিক। এ নিয়ে এ দেশের মানুষ অভ্যস্তও। অবশ্য সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে যানবাহনের তেমন চাপ থাকবে না। ফলে যন চলাচল–সংক্রান্ত বিপুল বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তাহলে শঙ্কাটি কোথায়?
প্রশ্নের উত্তরটি ডিএমপির আহ্বানেই রয়েছে। অশান্তির। আরও ভালো করে বললে, সংঘাতেই যত শঙ্কা। কিন্তু দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল মানে তো, তারা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীলও হওয়ার কথা। কারণ, রাজনীতির লক্ষ্য যতই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে হোক না কেন, তার মূলে তো রয়েছে মানুষ। মানুষ ছাড়া যেমন দল হয় না, তেমনি মানুষের সমর্থন ছাড়া কোনো দল বড়ও হয় না। তাহলে?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এখানে সবাই নীরব। কারণ, রাজনীতি আর ধ্রুপদি অর্থ বহন করছে না। এ দেশে এ ধরনের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার নজির আছে। তাও খুব বেশি আগের ঘটনাও নয়।
এ কারণে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচির কথা শুনলেই সাধারণ মানুষ তো বটেই আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রমাদ গুনতে বাধ্য হয়। আর এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি যদি হয় মাত্র ২ কিলোমিটার দূরত্বে, তাহলে তো কথাই নেই।
এটুকু হলেও হতো। একই দিনে আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক দল একই এলাকার আশপাশে সমাবেশ ডেকেছে। দুপুর ২টায় ফকিরাপুল থেকে নয়া পল্টন–কাকরাইল সড়কে মহাসমাবেশ করবে বিএনপি। একই সময় বিজয়নগর পানির ট্যাংকের সামনে হবে ১২ দলীয় জোটের সমাবেশ। গণতন্ত্র মঞ্চের সমাবেশ হবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিকেল ৩টায়।
এখানেই শেষ নয় পুরানা পল্টনে আল রাজি কমপ্লেক্সের সামনে দুপুর ২টায় হবে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমাবেশ। দুপুর ১২টায় গণতন্ত্র বাম ঐক্য জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি সমাবেশ করবে। একই সময় মতিঝিলের নটরডেম কলেজের কাছে গণফোরাম চত্বরে হবে গণফোরাম ও পিপলস পার্টির সমাবেশ। আর এলডিপি বিকেল ৩টায় পূর্ব পান্থপথে এফডিসির কাছে সমাবেশ করবে। বিকেল ৪টায় পুরানা পল্টন মোড়ে সমাবেশ হবে লেবার পার্টির। সকাল ১১টায় বিজয়নগর পানির ট্যাংকের কাছে সমাবেশ করবে গণঅধিকার পরিষদের (নূর) একাংশ।
ফলে ২৮ অক্টোবর রাজধানী এক সমাবেশের নগরীতে পরিণত হবে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল নিঃসন্দেহে বড় জমায়েত করতে যাচ্ছে। তারা করছে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ। বিপরীতে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো করছে সরকার পতনের দাবিতে সমাবেশ।
এ দুই বিপরীত অবস্থান এবং এ নিয়ে অনেক দিন ধরে চলা বাগ্যুদ্ধের জেরে এই সমাবেশগুলো আর সাধারণ বলে বিবেচিত হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে এমন কথা শুনছে, যা আর দায়িত্বশীল বলে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। ফলে অঘটনের শঙ্কা জেঁকে বসছে। পথে প্রান্তরে এই শঙ্কার কথাই বারবার ফিরে আসছে। সাধারণ মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখছে, তাদের স্বার্থে, তাদের জন্যই এবং একটি সুখি–সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যেই নাকি এমন মুখোমুখি অবস্থান!
অথচ একটি গণতান্ত্রিক দেশে তো এমন হওয়ার কথা নয়। গণতন্ত্র উদ্ধার হোক, বা গণতন্ত্র রক্ষা হোক, তা গণতান্ত্রিক পন্থায়ই তো হওয়ার কথা। কোনো হুঙ্কার নয়, কোনো হুমকি নয়, বরং বিভিন্ন পক্ষ বসে আলোচনার মাধ্যমে জনগণের স্বার্থে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থায় উপনীত হওয়ার কথা। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই?
নির্বাচন আসছে। এখনো তারিখ নির্ধারণ হয়নি। তবে হবে। যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এমন সময় খুবই ব্যস্ততার। জনগণের কাছে পৌঁছাতে নানা ধরনের কর্মসূচি তারা নেয়, নিতে হয়। এর মধ্যে সভা–সমাবেশ একেবারে নিয়মিত কর্মসূচি। কিন্তু এমন নিয়মিত কর্মসূচি নিয়েই নানা জল্পনা ও শঙ্কা নিয়ে কথা হচ্ছে দেশজুড়ে। এমনটা কেন? সে প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষ জানে। রাজনৈতিক দলগুলোও জানে নিশ্চয়। কিন্তু সেই জানার প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। এটি বেদনাদায়ক। এই বেদনা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোই। তারা কি সেটা করবে?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



