পর্যটন শিল্পে কেন আমরা পিছিয়ে?

পর্যটন শিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। রাজস্ব আয়ের দিক বিবেচনায় এটা বর্তমানে পঞ্চম স্থানে, আর আকার ও কর্মসংস্থানের বিবেচনায় প্রথম স্থানে রয়েছে। যদিও কোভিড-১৯ এর প্রভাবে এই শিল্পে প্রচণ্ড রকম ভাটা পড়ে। বলতে গেলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন শিল্প। কিন্তু কোভিড–পরবর্তী সময়ে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের প্রতিবেশী কিছু দেশের অর্থনীতিও অনেকটাই পর্যটন শিল্পের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। এদের মধ্যে মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার কথা আমরা জানি। এমনকি ভারতও পর্যটন শিল্প বিকাশের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে তুলছে। এই তালিকায় আছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও ইন্দোনেশিয়া।

এই দেশগুলোর রয়েছে প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত বহু এলাকা, যেগুলো মানুষকে আকৃষ্ট করে খুব সহজেই। যেমন মালদ্বীপের প্রবাল দ্বীপ, আর স্বচ্ছ সাগরের জল। ভারতের রয়েছে ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, প্রাকৃতিক শোভার এক বিপুল ভাণ্ডার, যা পর্যটন শিল্প বিকাশে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। নেপালের রয়েছে হিমালয় পর্বতমালার অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য আর পর্বতারোহণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার অবারিত সুযোগ। দূর প্রাচ্যের দেশ সিঙ্গাপুর। দেশ হিসেবে খুবই ছোট্ট একটা দ্বীপ রাষ্ট্র। তাদের নেই তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু পর্যটন শিল্প বিকাশের মাধ্যমে বিশ্বে দেশটি স্থান করে নিয়েছে। আর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স বিশ্বের অন্যতম সফল বিমান সংস্থা।

সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এই দেশগুলোর প্রকৃতি-পরিবেশ কোনো কিছুই পর্যটনবান্ধব নয়। রুক্ষ মরুপ্রান্তর, উষ্ণ আবহাওয়া, আর বৈরী ভূ-প্রকৃতি এই দেশগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি শুরু নিজস্ব জ্বালানি তেল প্রাপ্তির পর থেকে। রাতারাতি তারা ধনী দেশে পরিণত হয়। কিন্তু তারা পরবর্তীতে অনুধাবন করে যে, তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। সেই লক্ষ্যে তারা পর্যটন শিল্পে মনোযোগী হয়। বিনিয়োগ করে বিপুল। গড়ে তোলে পর্যটনবান্ধব আকর্ষণীয় স্থাপনা ও অবকাঠামো। এদের মধ্যে দুবাই-এর নাম সবচেয়ে আগে আসে। দুবাই হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাত রাজ্যের একটি। বর্তমান বিশ্বে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি হলো দুবাই। দুবাই তার তেলনির্ভর অর্থনীতিকে সাফল্যের সাথে সরিয়ে এনেছে পর্যটনের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ, যেমন বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব—সবাই পর্যটনে বিপুল বিনিয়োগ করছে। লক্ষ্য একটাই। আর তা হলো পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করা।

তাই এই খাতে উন্নয়নের চাবিকাঠি শুধু নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। যদি তাই হতো, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে যেত। তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের সমস্যা কোথায়? আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রচুর পর্যটক আসে। কিন্তু আমাদের দেশে বিদেশি পর্যটক বলতে তেমন কেউ আসে না। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান প্রভৃতি দেশের পর্যটক আসার পরিমাণ খুবই কম। যারা আসে, তারা মূলত ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোনো কাজে আসে। তবে ভারত থেকে কিছু পর্যটক আসে প্রতি বছর। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সরকারি ছুটির দিনে স্থান সংকুলান হয় না। বিশেষ করে কক্সবাজার, রাঙামাটি ও সিলেটে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বিদেশি পর্যটক তেমন একটা দেখা যায় না। এর পেছনে আসলে কারণ কী?

প্রথমত, পর্যটক আকর্ষণের জন্য যা যা প্রয়োজন, তা আমাদের রয়েছে। যেমন বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, সিলেটের চা বাগান ও লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বন, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওড় অঞ্চল, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড় জঙ্গল। এর সবই পর্যটক আকর্ষণের জন্য খুবই উপযোগী। শুধু তাই নয় খোদ ঢাকা শহরকেও পর্যটন আকর্ষণের জন্য গড়ে তোলা সম্ভব। ছিমছাম সবুজে ঘেরা চারিদিকে নদীবেষ্টিত কোলাহল ও যানজট মুক্ত হলে এই ঐতিহাসিক শহরও হয়ে উঠতে পারে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এখন দেখতে হবে পর্যটকরা কী চায়।

প্রথমেই আসে নিরাপত্তা। কেউ ঝুঁকি নিয়ে ঘুরতে যেতে চায় না। তাই অন্য যত কিছুই থাকুক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা না থাকা এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে পরিবারসহ যারা ঘোরাঘুরি করেন, তাঁদের জন্য এটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর প্রায় সব পর্যটন কেন্দ্রেরই অবকাঠামো খুব উন্নত। আমাদের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র দিন দিন আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হোটেল–রেস্তোরাঁ আর যানবাহনের ভিড়ে কক্সবাজার সৌন্দর্য, আর আকর্ষণ দুইই হারাতে বসেছে। অথচ একসময় নির্জন সমুদ্র সৈকত, ঝাউ বন, আর উত্তাল সাগরের গর্জন পর্যটকদের অন্য জগতে নিয়ে যেত। এখন শহরের কোলাহল থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার জন্য যেখানে যাব, সেখানেই যদি হাঁপিয়ে উঠি, তাহলে আর সেটা পর্যটন কেন্দ্র থাকল না। পর্যটকরা যাতে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে সব জায়গায় যাতায়াত করতে পারে, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

পর্যটন খাতে উন্নয়নের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিমান পরিবহন ও উন্নত বিমানবন্দর। বর্তমানে যেসব দেশ পর্যটন শিল্পে প্রভূত উন্নতি করেছে, তাদের প্রায় সবারই জাতীয় বিমান সংস্থাগুলো খুব ভালো অবস্থানে আছে। যেমন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, আরব আমিরাতের এমিরাটস, টার্কিশ এয়ার, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স। আমাদের বাংলাদেশ বিমানের অনেক সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা সফল হতে পারিনি। এ ছাড়া প্রয়োজন একটা অত্যাধুনিক সুবিধা যুক্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ ধরনের বিমানবন্দর ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় না হয়ে অন্য কোথাও হওয়া বাঞ্ছনীয়।

তুরস্ক পর্যটন শিল্পে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। তার মূলে রয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সব শ্রেণির পর্যটকের আর্থিক সঙ্গতির মধ্যে থেকে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে, যাতে সবাই তুরস্ক যেতে পারে। তবে পর্যটনের কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে যেভাবে পর্যটনকে উৎসাহিত করা হয়, তা মোটেও কাম্য নয়। এদিকে মালদ্বীপ ব্যতিক্রম। সেখানে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নির্ঝঞ্ঝাট সময় কাটানোর জন্য পর্যটকদের আগমন ঘটে।

পর্যটন খাত উন্নয়নের জন্য কী কী প্রয়োজন, তা খুব সংক্ষেপে বলার সুযোগ কম। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনাবিদেরা আছেন। তাঁরা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন আশা করি। তবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ আমাদের পর্যটন শিল্পকে যে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ড. ইজাজ আহসান: লেখক ও গবেষক