ফারাক্কা থেকে তিস্তা: বৈষম্যের অবসানে আন্তর্জাতিক পথই কি বাংলাদেশের শেষ ভরসা?

ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং উজানের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে তার প্রাপ্য ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত।

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ০১:০০ পিএম

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভাটি অববাহিকার দেশ যেখানে দেশের নদীগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি পানি আসে উজানের দেশগুলো থেকে। ভৌগোলিক এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবন উজান দেশের ন্যায্য পানি বণ্টনের উপরে নির্ধারণ করে।

ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং উজানের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে তার প্রাপ্য ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত।

প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে অসম রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে আলোচনার সুযোগ কম হওয়ায় উজানের দেশ হিসেবে ভারত প্রায়ই অন্যায় সুবিধা এবং অসম বণ্টনের সুবিধা পেয়ে থাকে।

অসম রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজমান থাকার কারণে গঙ্গা ও কুশিয়ারা– শুধু এই দুই নদীর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে গঙ্গা চুক্তির প্রায় পঁচিশ বছর পর কুশিয়ারা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু দশকব্যাপী আলোচনা সত্ত্বেও তিস্তা নদীর পানি–বণ্টন চুক্তির সঙ্গে এসব চুক্তিকে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এ অঞ্চলে পানি–রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টনের সমস্যা সমাধানে UN Conventions, Helsinki Rules (1966), Stockholm Conference (1972)–এর মতো আন্তর্জাতিক নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ–ভারতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও ক্ষমতার অসমতার কারণে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রায়ই কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয় এবং উজানের দেশ হিসেবে সবসময় বিশেষ সুবিধা ভোগ করে।

ভারতের ক্রমাগত বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে গঙ্গা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, কুশিয়ারা, মুহুরীসহ বহু নদীতে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশ কমে গেছে এবং গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পদ্মা অববাহিকার বহু নদী শুকিয়ে যায়, যার ফলে বড় একটি এলাকার কৃষি সেচ, মৎস্য ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভারতের প্রাদেশিক রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে আছে এবং ফলে রংপুর–দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে সেচ সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। ফারাক্কা থেকে তিস্তা, কুশিয়ারা থেকে মহানন্দা—  উজানে নির্মিত বাঁধ ও ব্যারাজগুলো ভাটির বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৬–১৪ সালের মধ্যে শুধু তিস্তা অববাহিকায় পানির অভাবে বোরো ধানের উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ (Star, 2023)। নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেখা দিচ্ছে তীব্র নদীভাঙন, পরিবেশগত অবক্ষয়, মৎস্য উৎপাদনের পতন ও মৌসুমভিত্তিক অভিবাসন।

বাংলাদেশ–ভারত যৌথ নদী কমিশন (১৯৭২) থাকলেও কার্যকর সমাধান আসেনি। ছয় দশকের ফারাক্কা বিরোধ এবং ২৫ বছরের গঙ্গা চুক্তিও সমতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পানি সংকট আরও জটিল হচ্ছে। ফলে পরিবেশগত ক্ষতি, ফসলহানি, জীবিকাহানি, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০ জুন ২০২৫ বাংলাদেশ জাতিসংঘের UN Convention on the Protection and Use of Transboundary Watercourses and International Lakes–এ যোগ দেয়, যা বিশ্বের একমাত্র বৈশ্বিক ও আইনিভাবে বাধ্যতামূলক পানি–বিধিমালা। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ আগে এই কনভেনশনে ছিল না; ফলে এটিকে বাংলাদেশ এক ধরনের কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

কনভেনশনটির মূল দর্শন তিনটি স্তম্ভ ন্যায্য পানি–বণ্টন, অন্যপক্ষকে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা, এবং বাধ্যতামূলক তথ্য–বিনিময় বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ—
•    উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার বা সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ তৈরি হবে।
•    বাধ্যতামূলক তথ্য–বিনিময় নিশ্চিত হলে বন্যা পূর্বাভাস, পানি ছাড় ও প্রকল্প–তথ্য আর অদৃশ্য থাকবে না।
•    দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত যৌথ নদী কমিশন–কে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্ল্যাটফর্মে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
•    জলবায়ু–সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও গবেষণা সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

তবে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয় কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো সদস্য না হলে কনভেনশনের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে, যার ফলে সমগ্র অববাহিকা জুড়ে এর বাস্তবায়নের সুযোগ কমে যায়। পাশাপাশি, এই কনভেনশনে যোগদান রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে, এবং এতে কঠোর প্রয়োগ–ব্যবস্থা নেই বরং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আলোচনা ও সহযোগিতার ওপরই নির্ভর করে। সার্বিকভাবে, কনভেনশনটি সহযোগিতামূলক পানি–শাসনের জন্য শক্তিশালী নীতিগত ও আইনি ভিত্তি দেয়; কিন্তু এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অববাহিকার গুরুত্বপূর্ণ উজান–ভাটির অংশীদারদের অংশগ্রহণের ওপর।। 

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান উজানের দেশ—ভারত ও চীন—এখনো এই কনভেনশনের সদস্য নয়। ফলে আঞ্চলিক বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা থেকেই যাবে। পাশাপাশি পরিবেশগত মূল্যায়ন, তথ্য–পরিচালনা ও নদীবিষয়ক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে। কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তব প্রভাব নিশ্চিত করতে দরকার শক্ত অবস্থান, টেকসই ডেটা এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনায় দক্ষতা।

বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, পানি এখন আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি কৃষি, পরিবেশ, শিল্প, জনস্বাস্থ্য, এমনকি মানবাধিকারের প্রশ্নেও রূপ নিয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। প্রয়োজন একটি শক্ত আন্তর্জাতিক ভিত্তি, যেখানে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যুক্তি ও অধিকার স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

UN Water Convention তথা জাতিংসঘ পানি সম্মেলন কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। কিন্তু এটি বাংলাদেশের কণ্ঠকে বৈশ্বিক পানি–মঞ্চে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এমন এক সময়, যখন নদীর পানি ক্রমশ ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে, সেখানে বাংলাদেশের জন্য এই কনভেনশন এক ধরনের নৈতিক ও আইনি শক্তি যেটি বলে দেয়, নদীর পানি আর অনুগ্রহ নয়; এটি একটি বৈধ অধিকার।

অমিতাভ কুন্ডু: লেখক ও গবেষক 
[email protected]

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
ইরানের ওপর ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর আন্তর্জাতিক যেসব রাজনীতিক এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন তাদের অন্যতম কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। নিজে দুরাযোগ্য ক্যানসারে অসুস্থ থাকার পরেও ইসরায়েল ও আমেরিকার...
ক্ষিণখানের মোল্লারটেক দোবাদিয়া এলাকায় শিশির তার এক বন্ধুর মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়। মোটরসাইকেলটি চালানোর সময় পেছন থেকে একটি দ্রুতগামী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার কারণে...
মশার উপদ্রব, অবৈধ স্থাপনা ও জলাবদ্ধতাসহ ১০টি বিষয়ে অভিযোগ জানাতে ও নাগরিক সুবিধা দিতে চালু হয়েছে আমাদের চট্টগ্রাম নামের অ্যাপস। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আনুষ্ঠানিকভাবে...
মৌলভীবাজারে ৯৯৬ কোটি টাকার মনু নদী সংরক্ষণ প্রকল্প চললেও রাজনগরে অব্যাহত নদীভাঙন। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত ২০ গ্রাম, দুর্ভোগে ৫০ হাজার মানুষ।
মানুষের প্রত্যাশা পুরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। শনিবার বিকেলে সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর