এতক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেছে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে কংগ্রেস সরকার গঠন করতে চলছে। রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভারত থেকে বিজেপি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। বিহার-পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেরালা-তামিলনাড়ু পর্যন্ত আট রাজ্যের কোথাও ক্ষমতায় নেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি।
গত ১০ মে বুথ ফেরত ভোটার জরিপ বা এক্সিট পোলে আভাস দেওয়া হচ্ছিল যে, কংগ্রেস কর্ণাটকে একক বৃহত্তম দল হতে চলেছে। কিন্তু আজ শনিবার ভোট গণনার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেল কংগ্রেস গতবারের চেয়ে ৫৬টি আসন বেশি পেয়ে ১৩৬ আসন নিয়ে সরকার গড়তে চলেছে। ২২৪ সদস্যের বিধানসভায় এতটা ভালো ফল বোধহয় কংগ্রেসের কোনো নেতাও আশা করেননি। ১৯৮৯ সালে বীরেন্দ্র পাতিলের নেতৃত্বে কংগ্রেস কর্ণাটকে ১৭৮টি আসন পেয়েছিল। এর পর এই প্রথম কোনো দল ১৩৬ আসন পেল। ফলে দল হিসেবে কংগ্রসের উৎফুল্ল হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
এই সাফল্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে কংগ্রেস কোনো জাতীয় ইস্যু নিয়ে ভোটে লড়তে যায়নি। বরং স্থানীয় বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে। যেমন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ তাঁর টুইটারে লিখেছেন- কংগ্রেস লড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনমান, খাদ্য নিরাপত্তা, দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি, কৃষকের দুরাবস্থা, বিদ্যুৎ না থাকা, বেকারত্ব এসব নিয়ে। এর সাফল্যও এসেছে ভোটবাক্সে।
তবে কংগ্রেসের বড় সাফল্য পুরো দলটাকে একটা টিম হিসেবে কাজ করাতে পারা। সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী অবশ্যই এই কৃতিত্বের ভাগীদার। মল্লিকার্জুন খাড়গে, ডি কে শিবকুমার, এস সিদ্দারামাইয়ার মতো প্রভাবশালী নেতাদের একসুতোয় বেঁধে রাখাটা চাট্টিখানি কথা না। তবে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতারা বুঝে গেছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। ক্ষমতা তো গেছেই, সাথে আপদের মতো জুটেছে ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্সসহ নানা কেন্দ্রীয় সরকারি মেশিনারি।
পাশাপাশি এই জয়ের পেছনে রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। এক হিসাবে দেখা গেছে, কর্ণাটকের যে বিধানসভা আসনগুলো দিয়ে এই যাত্রা গেছে, সেখানে বিজেপি জিততে পারেনি।
অন্যদিকে বিজেপি লড়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদার দাস মোদিকে দেখিয়ে। বিষয়টা এমন যেন মোদি ম্যাজিকে তুড়ি মেরে জিতে যাবে বিজেপি। দলের কর্ণাটক রাজ্যের প্রভাবশালী নেতা বি ওয়াই বিজয়েন্দ্র দুদিন আগেও বলেছেন, মোদি ম্যাজিকে সব উড়ে যাবে। তাঁরা এবার কমপক্ষে ১৩০টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন। বিজয়েন্দ্রর কথা ফেলনা নয়। তাঁর বাবা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে তাঁর বাবার অপসারণটা খুব একটা সুখকর ছিল না।
এই কারণে ওই রাজ্যে বিজেপির স্লোগানই ছিল রাজ্যের ২২৪ আসনে বিজেপি প্রার্থীর নাম নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী মোদিও কম চেষ্টা করেননি। রাজ্যে ৪৬টি জনসভা করেছেন। ২৫ কিলোমিটার রোড শো করেছেন। গত ছয় মাসে ১১বার রাজ্য সফরে গেছেন। সোনিয়া থেকে সন্ত্রাসের প্রতি নরম মনোভাব, বজরংবলী থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ফিরে আসার আশঙ্কা- মেরুকরণের কোনো চেষ্টাই বাদ যায়নি। কিন্তু ভোটের ফলে এসবের তেমন প্রভাব পড়েছে-এটা তাঁর অতি বড় মিত্রও বলবে না। এর আগে ২০২১-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় মোদি ১৭বার সফরে গিয়ে অন্তত ৬৬টি জনসভা করেন। তারপরও মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস আরও বেশি আসন পেয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসীন হয়।
কর্ণাটকের নির্বাচনের পর একটা কথা বিভিন্ন টিভি টক শো ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে, আসলে ‘মোদি ম্যাজিক’ বলে কিছু আছে কি না। বিশেষ করে রাজ্য নির্বাচনে। বিজেপি নেতাদের দাবি, গত এক বছরে ১০ রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে। এরমধ্যে আটটিতে বিজেপি বা বিজেপি-জোট জিতেছে। হেরেছে শুধুমাত্র হিমাচল প্রদেশ ও কর্ণাটকে। তাহলে 'মোদি ম্যাজিক’ বলে কিছু নেই এই কথাটা বিরোধীরা বলছেন কীভাবে? এর মধ্যে আপাত সত্য লুকিয়ে আছে। গত প্রায় ১০ বছরে নরেন্দ্র মোদির বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তেমন কোনো নেতাকে তুলে ধরতে পারেনি বিজেপি-বিরোধী দলগুলো। এ জন্য মোদির চড়া সুর, আর কড়া কথার পাল্টা তেমন কিছু শোনা যায় না। যাও শোনা যায় তা সাধারণ মানুষের মনে দাগ কাটতে পারেনি, এটাই সত্য।
২০১৪ সালের মে মাসে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাঁকে ব্র্যান্ড মোদি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলে। এতে বিজেপির আদর্শগত মূল প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সায় ছিল। যে কারণে মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলী মনোহর যোশীর মতো প্রবীণ নেতাদের ছেঁটে ফেলতে দ্বিধা করেননি। নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন ৭৫ বছর বয়স হলে বিজেপির কেউ সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। এতে এক ঢিলে অনেক পাখি মারা গেছে। আরও অনেক পাখি পড়ার অপেক্ষায়। মোদির বয়স এখন ৭২ বছর। ফলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনও তিনি পার করে দিতে পারবেন। আর ২০২৬-এ ৭৫ পেরোলে অমিত শাহ তো আছেনই, যাঁর বয়স মাত্র ৫৮ বছর। গত ৯ বছরে মোদি-বিজেপি-আরএসএস সব মিলেমিশে একটি শব্দে পরিণত হয়েছে। এদের কোনোটিকে আলাদা করার কোনো উপায় নেই। কারণ ব্র্যান্ড মোদি এতটাই শক্তিশালী। ফলে বিজেপি নেতারা যাই বলুন, আলু হলে নিচেরটা, ধান হলে ওপরেরটা- এই খোঁড়া যুক্তি মানুষকে মানানো কঠিন।
তবে কর্ণাটকে জিতে কংগ্রেসের বগল বাজানোর কিছু নেই। গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বে দলটি যদি এখান থেকে ইতিবাচক শিক্ষা নেয়, তাহলেই ভালো। কারণ শুধু গান্ধী পরিবারের সদস্যদের কারণে পাঞ্জাব ও উত্তরাখন্ড কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়েছে। এ বছর রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্যে নির্বাচন আছে। এর মধ্যে রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস ক্ষমতায়। কিন্তু রাজস্থানে প্রবীণ অশোক গেহলটের সাথে নবীন শচীন পাইলটের যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক, তাতে রাজ্যে আবার কংগ্রেস ফিরতে পারবে কিনা সন্দেহ।
কংগ্রেসের সুদিনে ইন্দিরা বা রাজীব গান্ধীর দল চালানোর পন্থাই ছিল রাজ্য নেতাদের একজনের সাথে আরেকজনের লাগিয়ে রাখা। এখন আর সেদিন নেই। দুঃসময়ে একসাথে পথ চলাই দলের জন্য ভালো ফল আনতে পারে। কর্ণাটক সেই প্রমাণ রেখে গেল। এখন সোনিয়া-রাহুল-প্রিয়াঙ্কা এই সত্য যত দ্রুত বুঝবেন, ততই তাদের দলের জন্য ভালো।
সেলিম খান: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন